ইনসাফ কোনো স্লোগান না, কোনো আবেগী কথা না। ইনসাফ মানে ন্যায্যতা, এমন ন্যায্যতা যেখানে ক্ষমতা, পরিচয়, দল, ধর্ম, শত্রু-মিত্র কোনো কিছুই বিচারকে প্রভাবিত করবে না। আমরা সবাই ইনসাফের কথা বলি, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে ইনসাফ কায়েম করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
ইনসাফের রাষ্ট্র মানে এমন রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক জানে সে দুর্বল হলেও নিরাপদ। যেখানে শক্তিশালী হলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না। এই জায়গায় পৌঁছাতে হলে কয়েকটা মৌলিক কাজ করতে হয়।
প্রথমত, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। আইন থাকতে হবে সবার জন্য এক। নেতা, আমলা, ধনী, গরিব, নিজের লোক, বিরোধী লোক, সবাই একই আইনের আওতায়। আইন যদি ক্ষমতাবানদের জন্য নরম আর সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়, তাহলে সেখানে ইনসাফ থাকে না, থাকে ভয়।
দ্বিতীয়ত, বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন করতে হবে। বিচারক যদি ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে রায় দেন, তাহলে আদালত থাকলেও ন্যায়বিচার থাকে না। দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রভাবমুক্ত বিচার ছাড়া ইনসাফ কল্পনাই করা যায় না।
তৃতীয়ত, জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতায় যারা থাকবে, তাদের নিয়মিত প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে। সংসদ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রশ্নহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জুলুমে পরিণত হয়।
চতুর্থত, নৈতিক রাজনীতি চর্চা জরুরি। রাজনীতি যদি শুধু জেতা-হারার খেলায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ইনসাফ টিকে না। রাজনীতিকে দায়িত্ব হিসেবে নিতে হবে, ব্যবসা হিসেবে নয়। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দরকার।
এই জায়গায় এসে ওসমান হাদির কথা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি যে ইনসাফ চাইতেন, সেটা প্রতিশোধের ইনসাফ না। তিনি স্পষ্ট করে বলতেন,
“আমি শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে চাই।”
এই কথার ভেতরে এক গভীর রাষ্ট্রদর্শন আছে। শত্রুর সাথেও ইনসাফ মানে, বিচার হবে কাজের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। যার সাথে রাজনৈতিক মতভেদ আছে, তাকেও মানুষ হিসেবে দেখা। তার অধিকার অস্বীকার না করা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার, গুজব বা আবেগের ভিত্তিতে নয়।
ওসমান হাদির ইনসাফ ছিল শক্তির প্রদর্শন নয়, চরিত্রের প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শত্রুর উপর জুলুম করে শক্তিশালী হওয়া যায় না, বরং ন্যায়বিচার করেই রাষ্ট্র শক্ত হয়। কারণ ইনসাফ মানুষকে রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস করতে শেখায়।
আজ আমরা যদি সত্যিই ইনসাফের রাষ্ট্র চাই, তাহলে শত্রু বানানোর রাজনীতি ছেড়ে ন্যায়ের রাজনীতিতে আসতে হবে। আজ যে শত্রু, কাল সে-ই নাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে সবাই নাগরিক, কেউ শত্রু না। শত্রুতা রাজনীতির হতে পারে, বিচার ব্যবস্থার না।
শেষ কথা একটাই। ইনসাফের রাষ্ট্র গড়তে হলে আগে ইনসাফের মানুষ তৈরি করতে হবে। যে মানুষ ক্ষমতায় গিয়েও ন্যায়ের সীমা মানে, যে মানুষ শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে পারে। ওসমান হাদি আমাদের সেই কঠিন কিন্তু সুন্দর পথটাই দেখিয়ে গেছেন।
“আমি শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে চাই।”