নিশাত যখন নিউজ ডেস্কে ঢুকল, ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাতটা। রাত আটটার বুলেটিন তার। হাতে স্ক্রিপ্ট, মনে অস্থিরতা। আজ শহরের বড় একটা অগ্নিকাণ্ডের খবর লিড নিউজ। স্টুডিওর এসির বাতাসেও নিশাতের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
ঠিক তখনই মেকআপ রুমের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন অয়ন। অয়ন এই চ্যানেলেরই সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার। ধুলোমাখা জ্যাকেট আর এলোমেলো চুল—সারাটাদিন স্পটেই ছিলেন তিনি। নিশাতকে দেখেই অয়ন থমকে দাঁড়ালেন।
“নিশাত, ভয় পাচ্ছেন?” অয়নের গলার স্বরে কেমন একটা ভরসা ছিল।
নিশাত মুখ না তুলেই বলল, “ভয় নয়, আসলে লাইভ আপডেটগুলো খুব দ্রুত আসছে তো, গুছিয়ে নিতে পারছি না।”
অয়ন নিঃশব্দে এগিয়ে এলেন। নিশাতের হাতে একটা কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা খান। আর শুনুন, অগ্নিকাণ্ডের খবরটা পড়ার সময় শুধু তথ্যগুলো দেখবেন না, মানুষের হাহাকারটা অনুভব করার চেষ্টা করবেন। বাচনভঙ্গিতে যেন কৃত্রিমতা না থাকে। আপনি পারবেন।”
নিশাত কফির মগ হাতে নিল। গরম কফির ধোঁয়া আর অয়নের কথাগুলো যেন ম্যাজিকের মতো কাজ করল।
বুলেটিন শুরু হলো। রেড লাইট জ্বলে উঠল ক্যামেরায়। নিশাত আজ যেন অন্য এক নিশাত। অত্যন্ত দরদ দিয়ে, স্পষ্ট স্বরে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করছেন তিনি। স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়ে অয়ন এক মনে মনিটরে দেখছিলেন নিশাতকে। সংবাদ উপস্থাপিকা নিশাতের চোখে আজ অদ্ভুত এক দ্যুতি।
বুলেটিন শেষ করে নিশাত যখন স্টুডিও থেকে বেরোলেন, দেখলেন অয়ন তখনো যাননি। লবিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
“অসাধারণ হয়েছে নিশাত,” অয়ন মুচকি হাসলেন।
নিশাত একটু ইতস্তত করে বলল, “আপনার কফিটা কিন্তু খুব তিতো ছিল। চিনি একদমই ছিল না।”
অয়ন হাসলেন। “জীবনটাও তো অনেকটা ওরকমই। তিতো জিনিসের মাঝেও একটু এনার্জি খুঁজে নিতে হয়। তা, এই তিতো কফির ঋণ শোধ করবেন কবে?”
নিশাত একটু লাজুক হেসে জানালার বাইরে রাতের শহরের দিকে তাকাল। বলল, “ঋণ তো অনেক হলো। আগামিকাল কি বৃষ্টির কোনো নিউজ আছে আপনার কাছে?”
অয়ন একটু অবাক হয়ে বললেন, “কেন?””বৃষ্টি থাকলে ঋণ শোধ করা সহজ হতো। এক ছাতার নিচে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো কফির বদলে অন্য কিছু ভাবা যেত,” নিচু স্বরে বলল নিশাত।
বাইরে তখন ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। স্টুডিওর কড়া আলো ছাপিয়ে দুজন মানুষের হৃদয়ে তখন অন্য এক বসন্তের নীল আলো জ্বলছে। নিউজ রুমের কর্মব্যস্ততার মাঝেও জন্ম নিল এক নিঃশব্দ ভালোবাসার গল্প।