শেষ ৭ মিনিট (২য় পর্ব): ছায়ার আড়ালে

আগের পর্বে আমরা দেখেছিলাম, অয়ন তার ৭ বছরের ভাগ্নি টুনিকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায়। কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই আলমারির আয়নায় লেখা এক বার্তা তার রক্ত হিম করে দেয়।

আমি এখনো এই ফ্ল্যাটের ভেতরেই আছি।

ভেবে দেখুন, একটা বদ্ধ ফ্ল্যাট, বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোলে একটা অসুস্থ বাচ্চা আর ঠিক আপনার পেছনেই লুকিয়ে আছে এক সাইকোপ্যাথ! পালানোর কোনো পথ নেই। এখন অয়ন কী করবে?

পড়ুন সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতের চূড়ান্ত পরিণতি— “শেষ ৭ মিনিট (২য় পর্ব)”।

শেষ ৭ মিনিট (২য় পর্ব): ছায়ার আড়ালে

আয়নার বুকে টকটকে লাল লিপস্টিক দিয়ে লেখা কথাগুলো পড়ার পর অয়নের মনে হলো ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

আমি এখনো এই ফ্ল্যাটের ভেতরেই আছি…

তার মানে কিছুক্ষণ আগে যখন অয়ন নিচতলার পার্কিং লটে স্পিকারের ধোঁকায় বোকা বনেছিল, তখন এই লোকটা শুধু টুনিকেই আলমারিতে বন্দী করেনি, সে নিজেও এই ফ্ল্যাটের কোনো এক অন্ধকার কোণে লুকিয়ে পড়েছে।

অয়ন আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। টুনি ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটাকে শক্ত করে কোলে তুলে নিয়ে সে পা টিপে টিপে বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এলো। টার্গেট একটাই—যেকোনো মূল্যে ফ্ল্যাটের মেইন দরজা খুলে বাইরে বের হওয়া।

ড্রয়িংরুম পার হয়ে মেইন দরজার কাছে পৌঁছাতেই অয়ন সজোরে ধাক্কা খেল।

দরজাটা ভেতর থেকে ডেডবোল্ট করা, কিন্তু চাবি নেই! কিছুক্ষণ আগে যখন অয়ন ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল, তখন দরজা খোলা ছিল। তার মানে, অয়ন ভেতরে ঢোকার পর লোকটা পেছন থেকে মেইন দরজার চাবি ঘুরিয়ে লক করে দিয়েছে এবং চাবিটা নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে।

তারা এখন নিজেদের ফ্ল্যাটেই বন্দী।

ঠিক সেই মুহূর্তে— খট!

পুরো ফ্ল্যাটের কারেন্ট চলে গেল। চারদিক নিমিষেই ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। শুধু ব্যালকনির কাঁচের দরজা ভেদ করে আসা আবছা চাঁদের আলো ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে একটা লম্বা ছায়া তৈরি করেছে।

অয়ন টুনির কানে ফিসফিস করে বলল, “একদম শব্দ করবে না মা, মামা আছে তো।

ওর ডান হাতে এখনো সেই ভারী মেটালের টর্চলাইটটা ধরা, কিন্তু সে সেটা অন করার সাহস পেল না। আলো জ্বালালেই লোকটা বুঝে যাবে তারা কোথায় আছে। অয়নের মনে পড়ল, রান্নাঘরের ড্রয়ারে মেইন দরজার একটা স্পেয়ার চাবি রাখা আছে। সে অন্ধকারের মধ্যেই সাবধানে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।

হঠাৎ ড্রয়িংরুমের সোফার পেছন থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো।

খ্যাঁচ… খ্যাঁচ…

কেউ একজন মেঝের ওপর ভারী মেটালের কিছু একটা টেনে টেনে আনছে। শব্দটা আস্তে আস্তে রান্নাঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে।

অয়ন দ্রুত টুনিকে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচের কেবিনেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, “যাই হয়ে যাক, তুমি এখান থেকে বের হবে না।

কেবিনেটের পাল্লা বন্ধ করে অয়ন সিঙ্কের পাশে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। হাতের টর্চলাইটটা শক্ত করে ধরল। মেটাল ড্র্যাগিংয়ের শব্দটা এখন ঠিক রান্নাঘরের দরজার মুখে।

চাঁদের আবছা আলোয় অয়ন দেখল, একটা দীর্ঘদেহী ছায়া রান্নাঘরে ঢুকছে। লোকটার গায়ে কালো হুডি, আর ডান হাতে একটা চকচকে রেঞ্চ।

ছায়াটা সিঙ্কের দিকে পা বাড়াতেই অয়ন আর অপেক্ষা করল না।

সে এক লাফে সামনে এসে টর্চের পাওয়ার বাটন প্রেস করল। হাজার লুমেন্সের তীব্র সাদা আলো সোজা লোকটার চোখে গিয়ে পড়ল। লোকটা চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে এক হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল, আর ঠিক সেই সুযোগে অয়ন হাতের ভারী মেটাল টর্চ দিয়ে সজোরে আঘাত করল লোকটার মাথায়।

একটা চাপা গোঙানি দিয়ে হুডি পরা লোকটা ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। হাতের রেঞ্চটা ছিটকে চলে গেল ফ্রিজের নিচে।

অয়ন এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে দ্রুত লোকটার প্যান্টের পকেট হাতড়ে মেইন দরজার চাবির গোছাটা বের করে আনল। এরপর সিঙ্কের নিচ থেকে টুনিকে কোলে তুলে নিয়ে দৌড়ে মেইন দরজার কাছে চলে এলো।

কাঁপা কাঁপা হাতে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলল অয়ন। তারপর সোজা সিঁড়িঘরের দিকে ছুটল।

লিফট নষ্ট, তাই অন্ধকার সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে শুরু করল তারা। তিন তলা… দুই তলা…

তারা যখন দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছাল, হঠাৎ অয়নের পকেটে থাকা ফোনটা আবার ভাইব্রেট করে উঠল।

অয়ন থমকে দাঁড়াল। স্ক্রিনে সেই একই নাম— ‘Unknown Number‘।

বুকটা ধক করে উঠল ওর। রান্নাঘরের মেঝেতে যাকে ও অজ্ঞান করে ফেলে এসেছে, সে তো কল করতে পারে না! তাহলে?

অয়ন কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই পরিচিত, হিমশীতল কণ্ঠস্বর।

“ব্রিলিয়ান্ট অয়ন! আমার ভাড়া করা লোকটাকে তুমি দারুণ মেরেছ। কিন্তু তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি এত সহজে ধরা দেব?”

অয়নের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সে চারপাশের অন্ধকারে পাগলের মতো চোখ বোলাতে লাগল।

কণ্ঠস্বরটা আবার বলে উঠল, “যাই হোক, টুনিকে বাঁচিয়ে তো আনলে। এবার টুনির হুডির পকেটটা একটু চেক করে দেখো তো অয়ন।

কলটা কেটে গেল।

অয়ন ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়ল। টুনির পরনে থাকা গোলাপি হুডির পকেটে হাত ঢোকাল সে। পকেট থেকে বেরিয়ে এলো একটা পোলারয়েড ছবি। ছবিটা একদম ফ্রেশ, এখনো কেমিক্যাল শুকাচ্ছে।

অয়ন মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে ছবিটার দিকে তাকাল। আর সেই দৃশ্য দেখে ওর পুরো শরীর পাথরের মতো জমে গেল।

ছবিটা ঠিক এই মুহূর্তের! অয়ন দোতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে, আর তার কোলে টুনি—এই দৃশ্যটার ছবি তোলা হয়েছে ঠিক ওপরের তলার সিঁড়ির রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে।

এর মানে… আসল মাস্টারমাইন্ড এতক্ষণ ধরে ওপর থেকেই ওদের দেখছে। সে এখনো ওদের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে!

অয়ন আস্তে আস্তে মাথা তুলে ওপরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। ওপরের তলা থেকে

একটা মৃদু হাসির শব্দ ভেসে আসছে…

তৃতীয় পর্ব করতে চাইলে কমেন্ট করুন 👇🥰

Join Community Banner

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com