বিরোধী দলে থাকলে অনেকেই খুব নীতিবান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো কথা বলে, দুর্নীতির সমালোচনা করে, জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই আচরণ বদলে যায়। যে মানুষটা একসময় প্রশ্ন করতো, সে-ই প্রশ্ন এড়িয়ে চলে। যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতো, সে-ই আপস করতে শুরু করে। প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ কিন্তু গভীর। ক্ষমতায় গেলে মানুষ কেন বদলে যায়?
প্রথম কারণ হলো ক্ষমতার স্বাদ। ক্ষমতা মানুষকে শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় না, বিশেষ সুবিধাও দেয়। প্রটোকল, সম্মান, ভয়ভীতি, চারপাশে সুবিধাভোগীদের ভিড়। এই পরিবেশ ধীরে ধীরে মানুষকে বাস্তবতা থেকে আলাদা করে ফেলে। ক্ষমতার ভেতরে বসে সাধারণ মানুষের কষ্ট আর আগের মতো দেখা যায় না।
দ্বিতীয় কারণ হলো সিস্টেমের চাপ। অনেক সময় ব্যক্তি একা বদলায় না, তাকে বদলাতে বাধ্য করা হয়। প্রশাসন, দলীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক হিসাব, আন্তর্জাতিক চাপ, নানা সমীকরণ। এখানে নীতিতে অটল থাকতে গেলে একা হয়ে পড়তে হয়। আর একা থাকার সাহস সবার থাকে না।
তৃতীয় কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। ক্ষমতায় গেলে যদি নিয়মিত প্রশ্ন না আসে, হিসাব না চাইতে হয়, তাহলে বদলে যাওয়া সহজ হয়ে যায়। যখন কেউ জিজ্ঞেস করে না, তখন বিবেকও ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। ক্ষমতা তখন দায়িত্ব না হয়ে অধিকার মনে হয়।
আরেকটা কঠিন সত্য হলো, অনেকেই ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বদলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। বাইরে নীতি, ভেতরে হিসাব। ক্ষমতা শুধু মুখোশটা খুলে দেয়। তাই সব পরিবর্তন ক্ষমতার কারণে হয়, এমন না। কিছু মানুষ আসলে আগেও একই ছিল।
তবুও সবাই বদলে যায় না। ইতিহাসে এমন মানুষ আছে, যারা ক্ষমতায় গিয়েও সোজা থেকেছে। তারা আলাদা কারণ তারা ক্ষমতাকে লক্ষ্য নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। চেয়ার নয়, মানুষের কথা ভেবেছে। সুবিধা নয়, সীমা মেনে চলেছে।
তাই প্রশ্নটা শুধু মানুষ কেন বদলায়, সেটা না। বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি ক্ষমতাকে বদলে দেওয়ার মতো কাঠামো বানাতে পেরেছি? শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন গণমাধ্যম, সচেতন নাগরিক ছাড়া কেউই ভালো থাকতে পারে না।
শেষ কথা হলো, ক্ষমতা মানুষকে বদলায় না সবসময়। ক্ষমতা মানুষকে প্রকাশ করে। আমরা কাকে ক্ষমতায় দিচ্ছি, আর ক্ষমতায় গিয়ে তাকে কতটা জবাবদিহির মধ্যে রাখছি, সেটাই আসল বিষয়।