ভাবুন তো, আপনি একা একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। ঘড়ির কাঁটায় রাত ৩টা। চারদিক সুনসান নীরব। হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে গেল। আপনি বিছানা থেকে নামলেন এক গ্লাস পানি খাওয়ার জন্য। কিন্তু দরজার দিকে তাকাতেই আপনার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল। আপনার বন্ধ দরজার ঠিক নিচ দিয়ে ফ্লোরে গড়িয়ে এসেছে এক ফোঁটা তাজা লাল রক্ত!
আপনি জানেন ফ্ল্যাটে আপনি সম্পূর্ণ একা। তাহলে এই রক্ত কোথা থেকে এলো?
যদি আপনার হার্টবিট এখনই বেড়ে গিয়ে থাকে, তবে ঘরের চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিন। কারণ এখন আপনি যে গল্পটি পড়তে যাচ্ছেন, তা শেষ করার পর আজ রাতে আপনার ঘুম আসা কঠিন হবে।
পড়ুন আজকের রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার গল্প— “শেষ ৭ মিনিট”।
শেষ ৭ মিনিট (The Last 7 Minutes)
রাত ঠিক ৩টা বেজে ১৫ মিনিট।
অয়নের ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। শীতে এসি চলছে, তবুও ওর কপাল ঘেমে একাকার। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। পানির জন্য বিছানা থেকে উঠতে গিয়েই সে থমকে দাঁড়াল। ওর বেডরুমের দরজাটা হালকা খোলা। আর ঠিক দরজার বাইরে ফ্লোরের সাদা টাইলসের ওপর এক ফোঁটা তাজা রক্ত। টকটকে লাল।
অয়নের শ্বাস আটকে এলো। সে একা থাকে এই চার তলার ফ্ল্যাটে। তাহলে এই রক্ত কোথা থেকে এলো?
সে নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামল। ড্রয়ার থেকে ভারী মেটালের টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগোল। বুকের ভেতর হার্টবিট যেন ড্রামের মতো বাজছে।
দরজার বাইরে পা রাখতেই অয়নের মনে পড়ে গেল এক ভয়াবহ সত্য। না, সে আজ রাতে একা নেই!
ওর ৭ বছরের ছোট ভাগ্নি, ‘টুনি’, আজ সন্ধ্যায় ওর কাছে থাকতে এসেছে। টুনির মারাত্মক অ্যাজমা আছে। উত্তেজনায় বা ভয়ে যেকোনো সময় ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। মেয়েটা পাশের গেস্ট রুমেই ঘুমাচ্ছে।
অয়ন আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দৌড়ে গেস্ট রুমের দিকে ছুটল।
গেস্ট রুমের দরজা হা করে খোলা। বিছানা ফাঁকা। টুনির বালিশের পাশে রাখা ইমার্জেন্সি ইনহেলারটাও গায়েব। বিছানার চাদরটা এলোমেলো, যেন কেউ জোর করে কাউকে তুলে নিয়ে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অয়নের পকেটে থাকা ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ভাইব্রেট করে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ‘Unknown Number‘। কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক, বিকৃত এবং শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“অয়ন… টুনির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ওর ইনহেলারটা আমার হাতে। তোমার হাতে ঠিক ৭ মিনিট সময় আছে আমাকে খুঁজে বের করার। ঠিক ৭ মিনিট পর মেয়েটার ফুসফুস আর কাজ করবে না। তোমার সময় শুরু হচ্ছে… এখন।”
কট। কলটা কেটে গেল।
অয়ন পাগলের মতো ফোনের স্ক্রিনে তাকাল। ৩টা বেজে ১৭ মিনিট। ৩টা ২৪ মিনিটের মধ্যে টুনিকে না পেলে সব শেষ। ওর হাতে এখন মাত্র ৪২০ সেকেন্ড!
অয়ন ড্রয়িংরুমে ছুটে এলো। সে দেখল, মেঝের ওপর রক্তের ছোট ছোট ছাপ সোজা মেইন দরজার দিকে চলে গেছে। মেইন দরজাটা বাইরে থেকে খোলা!
ঠিক তখনই সিঁড়িঘর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। কেউ একজন খুব তাড়াহুড়ো করে নিচে নামছে। জুতোর খটখট শব্দ পুরো বিল্ডিংয়ে ইকো হচ্ছে।
অয়ন আর কিছু না ভেবে, রান্নাঘর থেকে একটা ধারালো ছুরি হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে ছুটল। লিফট নষ্ট। চার তলা থেকে ঘুটঘুটে অন্ধকার পার্কিং লট পর্যন্ত দৌড়ে নামতে ওর ২ মিনিট চলে গেল।
পার্কিং লটের নিস্তব্ধতায় সে স্পষ্ট শুনতে পেল, গেটের কাছে একটা ছায়া নড়াচড়া করছে।
অয়ন হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছায়াটাকে জাপটে ধরল। কিন্তু একি!
এটা কোনো মানুষ নয়। একটা ময়লার ড্রামের ওপর একটা পোর্টেবল ব্লুটুথ স্পিকার রাখা। আর সেখান থেকেই ‘পায়ের শব্দ’ লুপে বাজছে। স্পিকারের নিচে একটা সাদা চিরকুট রাখা। টর্চের আলো ফেলে অয়ন পড়ল:
“তুমি ভুল জায়গায় খুঁজছ, অয়ন।”
অয়নের বুঝতে আর বাকি রইল না যে, ওকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে! ওকে ফ্ল্যাট থেকে বের করার জন্যই এই রক্তের ছাপ আর স্পিকারের নাটক সাজানো হয়েছে। আসল লোকটা ওর ফ্ল্যাটের ভেতরেই আছে!
অয়ন ফোনের টাইমার দেখল। ওর হাতে আর মাত্র ২ মিনিট আছে!
সে আবার সিঁড়ি বেয়ে পাগলের মতো ওপরে উঠতে শুরু করল। ফুসফুস ফেটে যাওয়ার জোগাড়। চার তলায় নিজের ফ্ল্যাটে যখন ঢুকল, তখন সে হাঁপাচ্ছে। পুরো ফ্ল্যাট আগের মতোই নিস্তব্ধ।
কোথায় থাকতে পারে টুনি?
হঠাৎ ওর মনে পড়ল সেই প্রথম রক্তের ফোঁটার কথা। রক্তের ফোঁটাটা ওর নিজের বেডরুমের বাইরে ছিল। কিন্তু কেন? গেস্ট রুম থেকে টুনিকে নিলে রক্ত তো গেস্ট রুমের বাইরে থাকার কথা!
সে দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকল। বিছানার নিচে টর্চ মেরে দেখল, কেউ নেই। হঠাৎ ওর চোখ গেল ঘরের কোণে থাকা পুরোনো মেহগনি কাঠের বিশাল আলমারিটার দিকে। আলমারির পাল্লাটা একটুখানি ফাঁকা।
টাইমারে বাকি আর মাত্র ২০ সেকেন্ড!
অয়ন এক ঝটকায় আলমারির দরজা খুলে ফেলল। যা দেখল, তাতে ওর রক্ত হিম হয়ে গেল।
ভেতরে কাপড়ের স্তূপের ভেতর টুনিকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। মেয়েটার মুখ নীল হয়ে আসছে, চোখ উল্টে যাচ্ছে। শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করছে। আর ঠিক তার মাথার ওপর একটা সুতো দিয়ে ঝোলানো আছে ইনহেলারটা—টুনির মুখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে, কিন্তু হাত বাঁধা থাকায় সে কিছুতেই ধরতে পারছে না!
১০ সেকেন্ড… ৯ সেকেন্ড…
অয়ন দ্রুত ইনহেলারটা ছিঁড়ে নিয়ে টুনির মুখে চেপে ধরল। পর পর দুইবার স্প্রে করার পর টুনি একটা লম্বা শ্বাস টেনে ডুকরে কেঁদে উঠল।
অয়ন মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ফ্লোরে বসে পড়ল। ওর নিজের চোখেও তখন পানি। ঘড়িতে তখন ঠিক ৩টা বেজে ২৪ মিনিট।
টুনিকে শান্ত করার পর, অয়ন যখন তাকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হবে, ঠিক তখনই ওর চোখ গেল আলমারির ভেতরের আয়নাটার দিকে।
সেখানে টকটকে লাল লিপস্টিক দিয়ে বড় বড় করে লেখা:
“আজকের মতো জিতে গেলে অয়ন। তবে মনে রেখো, আমি এখনো এই ফ্ল্যাটের ভেতরেই আছি। আর পরের বার… আমি ৭ মিনিট সময় দেব না।”
আপনার জন্য একটি প্রশ্ন:
আপনি যদি অয়নের জায়গায় থাকতেন, তবে এই মুহূর্তে আপনার প্রথম পদক্ষেপ কী হতো? পুলিশকে কল করা নাকি বাচ্চাটাকে নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে দৌড়ে পালানো? কমেন্ট করে জানান আপনার মতামত!
গল্পটি ভালো লাগলে এবং আপনার বন্ধুদের ভয় দেখাতে চাইলে এখনই শেয়ার করুন আপনার টাইমলাইনে!
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- শেষ ৭ মিনিট (২য় পর্ব): ছায়ার আড়ালে