রচনা লেখার নিয়ম । প্রবন্ধ রচনা লেখার কৌশল

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

রচনা লেখার নিয়ম উৎকৃষ্ট নিয়ম ক’জন বা জানি। কিন্তু প্রায়ই বিভিন্ন একাডেমিক পরীক্ষায় আমরা নানা ধরনের রচনা লিখে থাকি। আমরা অনেকেই রচনাকে প্রবন্ধও বলে থাকি। প্রবন্ধ শব্দের অর্থ হলো প্রকৃষ্ট রূপ। অর্থাৎ প্রবন্ধে বিষয়ের ভাব ও ধারা ইত্যাদির উল্লেখ থাকে।

অন্যদিকে রচনাতে ভাষার ভাব ও ধারার আলোচনা থাকে। রচনা শুধু লিখলেই হয় না। রচনা লিখতে হলে জানা প্রয়োজন কিছু কলাকৌশল বা নিয়মকানুন। রচনাকে সুন্দর ও সুস্পষ্ট করতে হলে রচনার গঠনপ্রণালীও জানতে হয়। কারণ কোনো কিছুর গঠন না জানা থাকলে, সেই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো কিছু লিখাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক রচনা লেখার নিয়ম ও রচনার গঠনপ্রণালী সম্পর্কে।

রচনা কী:

রচনা শব্দের অর্থ হলো সৃষ্টি করা বা নির্মাণ করা। শব্দের সঠিক বিন্যাসের মাধ্যমে কোনো তত্ত্বকে ভাষার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলাই হলো রচনা। ভাষাকে সুন্দর ও শুদ্ধরূপে প্রয়োগের মাধ্যমে একটি রচনাকে করে তোলা যায় প্রাণবন্ত ও সুন্দর। কোনো একটি মৃৎশিল্প তৈরির জন্য যেমন দরকার নতুন ও চমৎকার ডিজিাইন। তেমনি ভাষাকে সুন্দর করতে রচনা লিখার গুরুত্বের অন্ত নেই। রচনাতে চিন্তার ধারাবাহিকতা, কোনো বিষয়ের উপস্থাপনা, সংযত ভাষার ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ের প্রয়োগ থাকে।

রচনার গঠন:

যেকোনো লেখার, বলার বা শেখার ক্ষেত্রে প্রয়োজন উক্ত বিষয়ের গঠন সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। কোনো কিছুর গঠন না জানলে সেই বিষয়কে সহজে আয়ত্ত করা যায় না। ঠিক তেমনি রচনার গঠন সম্পর্কে না জানলে রচনা হয়তো লেখা যাবে তবে, একটি মানসম্মত ও আদর্শ রচনা লেখা যাবে না। সেজন্য আমাদের উচিত আগেই রচনার গঠন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা।

রচনা কয়টি অংশে বিভক্ত?

রচনার প্রধানত ৩ টি অংশে বিভক্ত। যথা- ভূমিকা, মূল বক্তব্য, উপসংহার।

১. ভূমিকা:

যে বিষয়ে রচনাটি লিখা হবে সেই বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ধারণা পাওয়া যায় ভূমিকাতে। ভূমিকা হলো মূলত রচনার প্রবেশপথ। রচনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সংক্ষেপন ভূমিকাতে উল্লেখ থাকে। আর ভূমিকা সংক্ষিপ্ত হওয়াই ভালো। বেশি বড় হলে সেটি আর ভূমিকা থাকে না।

২. মূল বক্তব্য:

মূল বক্তব্যে রচনার সাামগ্রিক বিষয়ের উপর একটা সম্পূর্ণ ধারণা থাকে। রচনাটির মূল বিষয়বস্তুর একটা স্পষ্ট তথ্য থাকে। আর এখানে কোনো বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলতে বা কোনো বিষয়কে ফুটিয়ে তুলতে ছোট ছোট অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন অনুচ্ছেদগুলোর ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে। ধারাবাহিকতা ঠিক না থাকলে মূল বক্তব্য তার সৌন্দর্য হারাবে। আর বক্তব্যকে স্পষ্ট করে তুলতে বিভিন্ন উদাহরণ, উপমা ও উদ্ধৃতি উত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। মূলত মূল বক্তব্যই হচ্ছে রচনার প্রধান অংশ।

৩. উপসংহার:

এটি হচ্ছে সিদ্ধান্তগ্রহণের ধাপ। একটি রচনার পুরো অংশের শেষ ধাপ হলো উপসংহার। আবার কোনো লেখক যখন তার নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে কিছু লিখে আর সেই লেখার সারসংক্ষেপ করে তখন সেটাই হয় উপসংহার। উপসংহারে অযথা তথ্য দেওয়া উচিত নয়।

রচনা লেখার নিয়মঃ

গতানুগতিক নিয়মে রচনা শুধু লিখে ফেললে হবে না। রচনা লিখার জন্য অবশ্যই কিছু জ্ঞান থাকা উচিত। অথবা সে বিষয়ে মোটমুটি জানাশোনা থাকা দরকার। কোনো কিছু জানা থাকলে তবেই সে বিষয়টি সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা। আর সেজন্যই রচনা লিখার বেলায় কী কী জানা থাকা প্রয়োজন সেই বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

বিষয় চিহ্নিতকরণ:

আপনি যে বিষয়ে রচনা লিখতে ইচ্ছুক বা আগ্রহী সেই বিষয়কে প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে।তা রপর সেই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে হবে। বিষয় চিহ্নিত না করে কোনোকিছুই লিখা যায় না। কারণ আপনি যা-ই লিখতে চান না কেন, সর্বপ্রথম আপনাকে একটি বিষয় চিহ্নিত করত হবে। অতঃপর সেই বিষয়ের উপর লিখা সাজাতে হবে।

দক্ষতা:

যে বিষয়ে রচনা লিখতে হবে সেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন খুবই জরুরি। কেননা বিষয়ের উপর যদি দক্ষতা না থাকে তাহলে সেই বিষয়ে অযথা বাক্য লিখে রচনা লিখা যায় না। একটি সুন্দর ও মানসম্মত রচনা লিখতে হলে অবশ্যই উক্ত বিষয়ের উপর দক্ষতা অর্জন দরকার। আর সেজন্য আমাদের উচিত বেশি বেশি রচনা পাঠ করা এবং রচনাকে গুছিয়ে লিখার চেষ্টা করা। এতে করে রচনা লিখার দক্ষতা দ্বিগুণ পরিমাণে বাড়বে।

অভিজ্ঞতা:

পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনোকিছুই লিখা সম্ভব না। আর তাই পূর্ব অভিজ্ঞতা বাড়াতে বর্তমানকে কাজে লাগাতে হবে। বর্তমানকে পড়াশোনার মধ্যে ডুবিয়ে দিতে হবে। কেননা আজকের বর্তমানই কিছুদিন পর অতীত হবে। আর সেটাই আমাদের কাছে পূর্ব অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিবে। কোনো বিষয়ে ভালো লিখতে হলে বা কোনো বিষয়কে সুন্দররূপে ফুটিয়ে তুলতে হলে উক্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকা খুব প্রয়োজন।

সম্যক জ্ঞান:

কোনোকিছু লেখার ক্ষেত্রে বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই উক্ত বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। কোনো বিষয়বস্তুর উপর যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে সেই বিষয়ে কোনোকিছু লিখাও যাবে না। আর সম্যক জ্ঞান না থাকলে কোনো বিষয়কে সহজ, সুন্দর ও সাবলীলভাবে ফুটিয়েও তোলা যায় না।

উপস্থাপন কৌশল:

কোনো বিষয়ে অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও বা কোনো বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকার পরও সেই বিষয়ে লিখতে হলে অবশ্যই লিখার কৌশল বা সেই বিষয়কে সুন্দররূপে তুলে ধরার কৌশল জানা থাকতে হবে। রচনা লিখার ক্ষেত্রে উপস্থাপনা একটি বিরাট জিনিস। উপস্থাপনা ছাড়া একটি রচনাকে সুন্দরভাবে সাজানো যায় না।

বিষয়বস্তুর স্পষ্ট ধারণা:

যেকোনো বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হয়। বিশেষ করে যদি রচনা লিখার কথাই বলা হয় তাহলে যে বিষয়ে রচনা লেখা হয় সেই বিষয়ের উপর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হয়। স্পষ্ট ধারণা ছাড়া কোনো বিষয় সহজতর হয়ে উঠে না।

ভাষাগত মাধুর্যতা:

রচনার ভাষাকে করতে হয় সুন্দর ও সাবলীল। সেজন্য আমাদের দরকার ভাষাগত দক্ষতা এবং ভাষাগত মাধুর্যতা। কেননা ভাষা সুন্দর না হলে রচনাটিও সুন্দর হয় না। রচনা লিখার বেলায় অবশ্যই ভাষার দিকে নজর দিতে হবে যেন রচনার ভাষা সুন্দর হয়। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ যেন না হয় সেই বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

ধারাবাহিকতা:

লিখার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। কেননা ধারাবাহিকতা রক্ষা না করলে লিখার মান ভালো হবে না এবং লিখায় কোন জিনিসটা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে না। একটি লাইন বা অনুচ্ছেদের পর অন্য কোন লাইন বা অনুচ্ছেদ বসবে সেটির ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। এছাড়া অনুচ্ছেদের এলোমেলো হলে রচনাটিই আর সম্পূর্ণ হবে না। শুধু রচনা লিখার ক্ষেত্রেই নয়, যেকোনো বিষয় লিখার ক্ষেত্রে উক্ত বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাটা আবশ্যক।

ভাব প্রদর্শন:

রচনার ভাষায় ভাবের সঞ্চার থাকতে হয়। রচনায় ভাবের প্রয়োগ না থাকলে রচনার ভাষা পাঠকদের মনে অনুভূতি জাগাবে না। রচনার ভাষা যেন নিরস মনে না হয় সেই বিষয়ে খেয়াল রেখে রচনার ভাষাকে ভাবগত দিক থেকে উন্নত করতে হবে। তবেই রচনাটি পাঠক-পাঠিকাদের মনে সহজে জায়গা করে নিবে।

গঠনগত সৌন্দর্য:

যেকোনো বিষয়ে গঠনগত দিক থেকে সুন্দর হলে উক্ত বিষয়ের পুরোটাই সুন্দর হয়ে উঠে। সেজন্য আমাদের সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যেন রচনার গঠনগত সৌন্দর্যে কোনো কমতি না থাকে। গঠনগত সৌন্দর্য বাড়ানোর দিকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে।

এছাড়াও যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়:

উপরোক্ত আলোচনা ছাড়াও রচনা লেখার নিয়ম গুলো ছাড়াও নানান বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। সেগুলোই নিচে আলোচনা করা হলো-

১. একটি রচনার ভাষা যেন শুদ্ধ হয়। অশুদ্ধ ভাষায় রচনা লিখলে কেউ ই সেই রচনা পড়বে না। সেজন্য আমাদের শুদ্ধ ভাষার দিকে জোর দিতে হবে।

২. রচনার নির্মাণশৈলী যেন মানসম্মত হয় সেই বিষয়েও অবগত হতে হবে। কেননা রচনার নির্মাণশৈলী তথা রচনার গঠনগত বৈশিষ্ট্য, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অথবা রচনার ভাষাগত বৈচিত্র্য ইত্যাদি সুন্দর না হলে রচনাটিও পড়ার উপযোগী হবে না।

৩. নিজের চিন্তা শক্তি, মননশীলতা, নিজস্ব অভিমত যেন রচনার উপযোগী হয় সেই বিষয়েও খেয়াল রাখা জরুরি। নিজের চিন্তা শক্তি সুন্দর হলে লেখার মানও সুন্দর হবে।

৪. প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সমাহার দিয়ে একটি রচনাকে সাজাতে হবে। অবান্তর তথ্য দিয়ে রচনা বড় করে লিখলেও রচনা মানসম্মত হবে না।

৫. যুগোপযোগী শব্দ এবং বাক্যের প্রয়োজন থাকা আবশ্যক। এছাড়াও একটি রচনাকে সুন্দর করে তুলতে সকল বিষয় মাথায় রাখতে হবে এবং লেখার মানকে উন্নত করতে হবে।

আরো পড়ুন-  এসএসসি রেজাল্ট ২০২৪ কবে দিবে? SSC Result চেক করুন খুব সহজেই

৬. একটি রচনাতে পঠিত বিষয়ের উপর যুক্তির সুশৃঙ্খল প্রয়োগ থাকতে হয়। যুক্তিসম্মত বাক্য ছাড়া রচনা পরিপূর্ণ হয় না।

৭. বর্ণনামূলক লেখা পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে অযথা সমাস, সন্ধির প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় নয়। এত বিস্তারিত না লিখে রচনার মূল বিষয়বস্তুকে সংক্ষেপেন করে লিখলে রচনাটি সুন্দর হয়।

৮. সময়ের সঙ্গে সংযোগ রেখে বা মিল রেখে রচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করাটা একটা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে করে রচনাটি সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

৯. রচনা লেখায় দক্ষতা অর্জনের জন্য পত্রিকার বিভিন্ন কলাম পড়া যেতে পারে এতে করে অর্জনটা ভালো হবে এবং লেখার মানও সুন্দর হবে।

১০. রং, স্বাদ, গন্ধ ও অনুভূতি ইত্যাদি ব্যবহার এবং ইত্যাদি বর্ণনার মধ্য দিয়ে রচনাকে ছবির মতো ফুটিয়ে তোলা যায়। আবার রচনার রস আস্বাদনেও রচনাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না।

সর্বোপরি বলা যায় যে, রচনা লেখার নিয়ম এর ক্ষেত্রে রচনার কলাকৌশল এবং রচনার গঠন জানা অতীত জরুরি। গঠন ও কলাকৌশল জানা থাকলে একটি রচনা হয়ে উঠে সুন্দর ও আর্কষণীয়। আর পাঠকদের মনে রচনাটি জায়গা করে নিতে সহজ হয়।

পাঠক বিডি’র পাঠক হয়ে সাথে’ই থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।

গুগল নিউজে পড়ুন- পাঠক বিডি

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com