হাজং কারা? তাদের লোকসাহিত্য ও সংগ্রামের ইতিহাস

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

হাজং হলো বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম। মোঙ্গলীয় নৃগোষ্ঠীভুক্ত হাজংরা আচার, রীতি-নীতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের জন্য স্বতন্ত্র। তাদের রয়েছে সচেতনতা এবং স্বাধীনচেতা সংগ্রামের ইতিহাস। এছাড়া আছে সমৃদ্ধ সাহিত্য। নিজস্ব গান, নাচ, নাটক, ধাঁধা, গল্প সব মিলিয়ে তাদেরও আছে সমৃদ্ধ সাহিত্যের ইতিহাস।

হাজংদের আবাসভূমি

বাংলাদেশের বেশিরভাগ হাজং বসবাস করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায়৷ এ জেলার সুসং দূর্গাপুর, কলমাকান্দা, ধোবাইড়া, নলিতাবাড়ি, শ্রীবর্দি স্থানে তাদের বসতি দেখা যায়। এছাড়া বৃহত্তর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্বরপুর, তাহেরপুর, ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে তাদের দেখা মেলে। বাংলা ১৩৩৯ সনে উক্ত অঞ্চলে প্রায় ৪০০০০ হাজং বসবাস করতো জানা যায়।

এছাড়া ভারতেও হাজংদের বসবাস আছে। মেঘালয়ের গারো হিলস ও খাসিয়া হিলস, আসামের নওয়াগাঁও, দরং, কামরূপে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এদের দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, শান্তিপুর ও খরদেও এলাকায় অল্প পরিমাণ হাজং বসবাস করে।

হাজং নাম এবং সংগ্রামের ইতিহাস

হাজং নাম নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণ যেটি প্রচলিত আছে তাদের কাছে, তারা মনে করেন এই নামটি গারোদের দেওয়া। মান্দিভাষায় হাজং মানে মাটির পোকা। “হা” অর্থ মাটি, এবং “জং” অর্থ কীট বা পোকা। হাজংরা কৃষিকাজে পারদর্শী এবং খুব মনোযোগী ছিলো, তাই এমন নাম!

নৃতত্ত্ববিদ হাডসনের মতে – হাজং শব্দটি কাছাড়ী শব্দ হাজো থেকে এসেছে। কাছাড়ী ভাষায় ‘হা’ অর্থ পাহাড় এবং ‘জো’ অর্থ পাহাড়। পাহাড় পর্বতে থাকতো বলে তাদের কাছাড়ী ভাষায় হাজো বলতো। আবার নৃতত্ত্ববিদ কলোনেল ডাল্টন, রুনি প্রমুখের মতে – কাছাড়ী ভাষার শব্দ হাজাই থেকে হাজং শব্দের উৎপত্তি। হাজাই অর্থ সমতলবাসী৷ তারা মনে করেন, কাছাড়ীরা দুইদলে বিভক্ত। একটি হচ্ছে সমতলবাসী, অপরটি পর্বতবাসী।

হাজংদের বর্ণাঢ্য সংগ্রামের ইতিহাস আছে তা আগেই উল্লেখ করেছি। একসময় হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে এই শান্তিপ্রিয় কৃষিনির্ভর হাজং জাতি সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলো৷ ১৯৪৬ হতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সুসং পরগনার জমিদারদের বিরুদ্ধে ‘টংক’ বা খাজনা আন্দোলন সংগঠিত হয়। বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রবীণ নেতা কমরেড মনিসিং উক্ত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। অসংখ্য হাজং এই আন্দোলনে প্রাণ হারায়। অনেকেই অত্যাচারের ভয়ে পালিয়ে যান ভারতে। কুমুদিনী হাজং এই আন্দোলনের একজন নেত্রী হিসেবে এখনও বিখ্যাত হয়ে আছেন।

তবে, হাজংদের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ ছিলো হাতিখেদা বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সংগঠিত হয়। তখন সুসং জমিদারেরা দূর্গাপুর এলাকা থেকে হাতি ধরে ঢাকা ও কলকাতায় বিক্রি করতো। হাজংরা এই কাজে ছিলো দক্ষ। এই দক্ষতা কাল হয়েছিলো তাদের জন্য! নিষ্পেষিত হতে হয়েছিলো জমিদারদের লোভের আগুনে। পরবর্তী কোন লেখায় হাজংদের বিদ্রোহ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবো।

হাজং লোকসাহিত্য

হাজংদের আক্ষরিক কোনো ভাষা নেই। তাদের ভাষা নিয়ে কোন সমাজবিজ্ঞানী সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। আচার্য গ্রীয়ারসন মনে করেন, হাজং ভাষা বাংলারই উপভাষা। আবার অহমীয়া ভাষার সাথেও এর যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। আবার দেখা যায় চাকমা এবং পালি ভাষার সাথে যথেষ্ট মিল আছে এই ভাষার। এই ভাষা যেহেতু লিখিত আক্ষরিক রূপ নেই। তাই হাজংরা বাংলা ভাষাতেই তাদের লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের লোকসাহিত্য নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এই কথাটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে আমাদের।

আর সব জাতির লোককথার মতো অনেক লোককথা ছড়িয়ে আছে। কিছু কিছু সংগ্রহ করা গেছে। কিছু আবার লিপিবদ্ধ না হওয়ার কারণে হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। যা লোককাহিনী পাওয়া যায়, তাকে মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

১. এ্যানিমেল টেল বা জীব জন্তু নিয়ে উপকথা

২. রূপকথা, যেখানে বোকা রাক্ষস সাহসীকতা  এবং সততার জয়গান, যাদুশক্তি বা রোমাঞ্চকর ঘটনার বর্ণনা।

৩. হাসির গল্প, যেখানে বোকা জামাতা বা বোকা ভূত নিয়ে হাস্যরস করার গল্প।

অনেক কথাবার্তার পর; চলুন, সরাসরি একটা হাজং লোককথা পড়ে ফেলা যাক।

লেবু ও জাম্বুড়া কাহিনী

লেবু ও জাম্বুড়া দুই ভাই। লেবু বড় আর জাম্বুরা ছোট। লেবু খুব সহজসরল, সে মোড়লের বাড়ি কাজ করে। আর জাম্বুড়া খুব চালাকচতুর। সে বাড়িতেই থাকে, খায় আর ঘুমায়।

কিন্তু লেবুর মোড়ল ভালো লোক ছিলো না। তার বাড়িতে কাজ করতো সবাই এক শর্তে। শর্ত হলো, “এক আঙ্গুলের পীড়া, দুই আঙ্গুলের পাত, নাচায় কলে না দিবো ভাত। খায়ে উঠেই ঢিকি পাও, ঝিরারা চালে নালে বাড়ি যাও”। অর্থাৎ ” এক আঙ্গুল পরিমাণ পীড়িতে বসে, দুই আঙ্গুল পরিমাণ পাতে খেতে হবে, একবার না বললে আর ভাত দেওয়া হবে না। খেয়ে উঠেই ঢেঁকিতে পা দিতে হবে, বিশ্রামের জন্য পাটক্ষেতে যেতে হবে”। এই নিয়মে লেবুর খুব কষ্ট হয়। এক আঙ্গুলী পীড়িতে, দুই আঙ্গুলের পাতে একমুঠি ভাতও ধরে না! সব ভাত মাটিতে পরে যায়।

তাই মাঠিতে পরার ভয়ে দ্বিতীয় মুঠ দিতে এলে না করতে হয়। শর্তনুসারে আর ভাত চাইতে পারে না! হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করে কয়েকটু মাত্র ভাত খেয়ে থাকতে হয়। উঠেই যেতে হয় ঢেঁকিতে, একটানা চাল ছাটা, ধান ভাঙা চলতে থাকে। আবার বিশ্রামের জন্য পাটক্ষেতে গেলে, পাট কাটতে হয়। এইভাবে চলতে চলতে লেবু শুকিয়ে কাঠ! চেহারার দিকে তাকানোই যায় না। তখন এগিয়ে এলো জাম্বুড়া। বর ভাই থেকে সব শুনে, তাকে বললো ঘরে বিশ্রাম নিতে। সে সোজা চলে গেলো মোড়লের বাড়িতে আর একই শর্তে কাজ নিতে রাজি হলো।

জাম্বুড়ার বুদ্ধির খেলা

এইবার শুরু হলো জাম্বুড়ার বুদ্ধির খেলা। খাবারের সময় দু’আঙ্গুল ভাত দিতে এলে সে না করলো না। ভাত মাটিতে গড়িয়ে স্তুপ হয়ে গেলো। সে শুধু উপরের টুকু খেলো। খেয়েই গেলো ঢেঁকিতে। সেখানে ঢেঁকির উপর পা রেখেই ঘুম! জিজ্ঞাসা করলে বললো, ঢেঁকিতে শুধু পা উঠানোর কথা, ধান ভাঙার কথাতো নেই। আবার সময়মতো, পাটক্ষেতে গিয়ে বসে থাকলো। আবার জিজ্ঞাসা করলে বললো, এইখানে শুধু বিশ্রামের কথা, পাট কাটার তো কথা নেই। শর্ত মোতাবেক মোড়ল তাকে কোনো চাপ দিতে পারলো না। এভাবে কয়েকদিন যেতে জাম্বুরা নাদুস নুদুস, মোটাসোটা আর সুখী সুখী চেহারার হয়ে গেলো।

মোড়ল বুঝতে পারলো এতো উটকো বিপদ! জাম্বুড়ার এই কার্যকলাপ বেশিদিন চললে, বাকি চাকরেরা বিগড়ে যাবে।  তাই জাম্বুড়াকে একদিন ডেকে অপরাধ স্বীকার করে আর বলে, তুমি বাড়ি চলে যাওতো বাপু। তোমাদের দুই ভাইয়ের জন্য প্রতিমাসে চাল পাঠিয়ে দিবো আমি। জাম্বুড়া বাড়ি চলে আসে। তারপর আর তাদের কখনো অভাব হয়নি। তবে, অনাহার আর দীর্ঘখাটুনীর জন্য লেবু যে শুকালো, তার চেহারা আর ফিরলো না। লেবু আর জাম্বুড়ার বংশধররা এখনও সেই চেহারা নিয়ে চলছে। পাঠক বিডি’র পাঠক হয়ে সাথে’ই থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।

গুগল নিউজে পড়ুন- পাঠক বিডি

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com