ময়মনসিংহ জেলা ইতিহাসের অনেক পুরনো ও বিখ্যাত একটি। প্রবাদ প্রবচনে উল্লেখ আছে হাওড়, জঙ্গল, মইষের শিং এই তিনে মিলে ময়মনসিংহ। এছাড়াও Mymensingh শব্দটির বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়- My-men-sing যার অর্থ আমার লোকেরা গান গায়। ময়মনসিংহ গীতিকা বিশ্ব দরবারে ময়মনসিংহের নিজস্ব পরিচয়কে অলংকৃত করেছে। ময়মনসিংহের বাস্তবচিত্রের কাহিনী বোনা হয়েছে স্বপ্নের নকশী কাঁথায়। ময়মনসিংহের গৌরব গাঁথা ইতিহাস করেছে মহুয়া মলুয়া। আর মহুয়া মলুয়া থেকে জয়নুল আবেদীনের চিত্র হয়ে উঠেছে বিশ্বময়। বাতাসে বাতাসে বীরত্বের হৃদয় ছোঁয়া ইতিহাস ছড়িয়েছে ঈশাখাঁর যুদ্ধ বা সখিনা-সোনাভানের কাহিনী। এছাড়াও ময়মনসিংহ জেলার পটভূমি নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক ইতিহাস।
নামকরণ:
ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে ময়মনসিংহ জেলার নাম নিয়ে। সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর পুত্র সৈয়দ নাসিরউদ্দিন নসরত শাহ এর জন্য ষোড়শ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে একটি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আর তারই প্রেক্ষিতে নাসিরাবাদ বা নসরতশাহী নামের সৃষ্টি। সেজন্য ময়মনসিংহের পূর্বনাম আমরা নাসিরাবাদ বলি। ১৭৭৯ সালে মোমেসিং শব্দটি ময়মনসিংহ অঞ্চলকে নির্দেশ করেছে। এছাড়াও আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে মিহমানশাহী সকার বাজুহার পগনা হিসেবে উল্লেখ আছে। যা কিনা বর্তমানে ময়মনসিংহকে ধরা হয়।
জেলা ঘোষণা:
১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১লা মে ময়মনসিংহ জেলা গঠিত হয়। এই জেলার ইতিহাস অতি প্রাচীন। ময়মনসিংহ নতুন ৬ টি জেলায় বিভক্ত হয় ১৮৬৪ সালের পরে। যথা- ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল জেলা, ১৯৭৮ সালে জামালপুর জেলা, ১৯৮৪ সালে শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা। অর্থাৎ ময়মনসিংহসহ মোট ৬ টি জেলায় বিভক্ত হয়।
আয়তন:
২৪°০২’০৩” থেকে ২৫°২৫’৫৬” উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°৩৯’০০” থেকে ৯১°১৫’৩৫” পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অবস্থিত আমাদের ময়মনসিংহ জেলা।
অবস্থান:
ময়মনসিংহ জেলার পূর্বে কিশোরগঞ্জ জেলা ও নেত্রকোনা জেলা,পশ্চিমে জামালপুর জেলা, টাঙ্গাইল জেলা ও শেরপুর জেলা। এবং উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও দক্ষিণে গাজীপুর জেলা রয়েছে৷
জনসংখ্যা:
বাংলাদেশের ৮ম বিভাগীয় শহর ও ১২ তম সিটি কর্পোরেশন ময়মনসিংহ।ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন আয়তনে দেশের ৭ম এবং জনসংখ্যায় ৮ম বৃহত্তম মহানগর হলো ময়মনসিংহ। ২০২২ সালের ডিজিটাল জনশুমারী ময়মনসিংহের স্থায়ী জনসংখ্যা ৫,৭৬,৭২২ জন।
সম্পদসমূহ:
প্রত্যেক জেলারই নিজস্ব কিছু সম্পদ রয়েছে। হতে পারে সেগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ,মৎস্য সম্পদ বা পশু সম্পদ ইত্যাদি ইত্যাদি।নিচে ময়মনসিংহের সম্পদগুলো আলোচনা করা হলো-
১। প্রাকৃতিক সম্পদ: কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন: বালিপাড়া বালুমহাল, হালুয়াঘাট বালুমহাল, মরিচারচর বালুমহাল,ধোবাউড়া সাদা মাটি মহাল ইত্যাদি।
২। মৎস্য সম্পদ: বেশকিছু মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে ময়মনসিংহে।
৩। পশু সম্পদ: ময়মনসিংহের প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা অফিস রয়েছে ভালুকা,ফুলপুরে ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য স্থান:
ময়মনসিংহে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেগুলোর ইতিহাস বেশ পুরোনো ও রহস্যময়।উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হলো-
১। ময়মনসিংহ জাদুঘর: এটি ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় অবস্থিত৷ এটি ময়মনসিংহের অনেক সংস্কৃতি ও ইতিহাস বহন করে।
২। জয়নুল আবেদিন পার্ক: এটিতে অনেক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম রয়েছে এবং এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে জয়নুল আবেদিনের নামানুসারে।
৩। মধুটিলা ইকো পার্ক: শেরপুর জেলায় অবস্থিত একটি পার্ক।এটি একটি ইকো-ট্যুরিজম পার্ক। এখানে অনেক গাছপালা ও প্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে।
৪। বিজয়পুর চায়না মাটির পাহাড়: নেত্রকোনা জেলার বিজয়পুরে অবস্থিত।
৫। মালঞ্চ মসজিদ: জামালপুর জেলায় অবস্থিত। আর এটি সপ্তদশ শতকের একটি চমৎকার নিদর্শন।
৬। হাসান মঞ্জিল: এটি ঊনবিংশ শতকের একটি জটিল স্থাপত্য।
৭। চায়না মাটির লেক: নেত্রকোনা জেলায় অবস্থতি চায়না মাটির তৈরি একটি লেক।
৮। শশীলজ: সুন্দর এই প্রাসাদটি ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি নিদর্শন। এটি মহারাজ শশীকান্ত আচার্য নির্মাণ করেন।
৯। বোটানিক্যাল গার্ডেন: অসংখ্য রকমের ফুল ও গাছপালা বেষ্টিত একটু উদ্যান।
১০। হযরত শাহ জামার (রা:) এর মাজার: এটি জামালপুর জেলায় অবস্থিত ধর্মীয় পর্যটন হিসেবে পরিচিত।
১১। গজনী অবকাশ কেন্দ্র: এটি শেরপুর জেলায় অবস্থিত। একটি সুইমিং পুল,খেলার মাঠ নিয়ে তৈরি একটি চমৎকার বাড়ি এটি।
বিখ্যাত বক্তিবর্গ:
ময়মনসিংহে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। নিচে এমন কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হলো-
১। কাজী নজরুল ইসলাম: ময়মনসিংহের চুরুলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে পরিচিত।
২। দীনেশচন্দ্র সেন: তিনি একজন সমাজ সংস্কারক এবং বিখ্যাত একজন বাঙালি লেখক। তিনি ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
৩। কবিকঙ্ক: তিনি একজন বিখ্যাত লেখক। ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন।
৪। কানাহরি দত্ত: মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি তিনি।
৫। খাজা উসমান খাঁন লোহানী: তিনি উত্তর-পূর্ব বাংলার একজন পাঠান সর্দার এবং সাথে একজন যোদ্ধা।
৬। করম শাহ: তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধী আন্দোলনের নেতা।
৭। হেমেন্দ্রমোহন বসু: তিনি একজন প্রখ্যাত বাঙালি ব্যবসায়ী।
৮। কেদারনাথ মজুমদার: তিনি বিখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং ইতিহাসবিদ।
৯। হেমেন্দ্রকিশোর আচার্য চৌধুরী: ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। তিনি অগ্নিযুগের একজন বিপ্লবী।
১০। ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী: তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব এবং একজন অগ্নিকন্যা।
১১। মুজিবুর রহমান খান ফুলপুরী: ময়মনসিংহের একজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী তিনি।
১২। চন্দ্রকুমার দে: তিনি একজন লেখক এবং ময়মনসিংহে প্রচলিত লোকগীতির বিখ্যাত সংগ্রাহক।
১৩। আনন্দকিশোর মজুমদার: উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
১৪। সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ: তিনিও ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
১৫। মৌলভী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পাহলোয়ান: অবিভক্ত বাংলার আইনসভার একজন সদস্য।
১৬। শ্রী নরেন্দ্রচন্দ্র ধর: তিনি একজন পণ্ডিত ও সন্ন্যাসী।
১৭। আবুল কালাম শামসুদ্দীন: তিনি একইসাথে রাজনীতিবিদ,ভাষাবিদ ও সাংবাদিক।
১৮। আবুল মনসুর আহমেদ: তিনিও একাধারে একজন সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিক।
১৯। হেলেনা খান: তিনি একজন গল্পকার, অনুবাদক ও ঔপন্যাসিক।
২০। নরেশ রায়: তিনি ট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে জড়িত বিপ্লবী এবং ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব।
বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা:
ময়মনসিংহে অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন।যারা কিনা দেশের সম্মান রক্ষার্থে একাত্তরের মহাযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন। নিচে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করা হলো-
১। আবদুর রশিদ: তার পিতার নাম আবদুল কাদের (মমতাজ আলী) এবং তার গ্যাজেট নম্বর-১২১২।
২। ইদ্রিস আলী: তার পিতার নাম চানফর আলী এবং তার গেজেট নম্বর-১২১৩।
৩। ইদ্রিস আলী: তার পিতার নাম মো: ইসহাক আলী সরকার এবং তার গেজেট নম্বর-১২১৪।
৪। চান মিয়া: তার পিতার নাম আ: মোমেন এবং তার গেজেট নম্বর-১২১৫।
৫। নাদেরুজ্জামান খান: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।
বিখ্যাত খাবার:
জাকির মিয়ার জিলাপি; ময়মনসিংহের বিখ্যাত মিষ্টি। এছাড়াও ময়মনসিংহে অনেক সুস্বাদু ও বিখ্যাত খাবার রয়েছে।
ময়মনসিংহের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান:
কোনো জেলার ইতিহাস পড়তে গেলেই সবার আগে চোখে পড়ে সেই জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর। ময়মনসিংহের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম নয়।ময়মনসিংহেও রয়েছে নামি-দামি ও বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যথা-
- ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ
- আনন্দমোহন কলেজ
- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ময়মনসিংহ জেলা যে কারণে বিখ্যাত:
কিছু আলাদা কাজ বা আলাদা কোনো ইতিহাসের জন্যই ময়মনসিংহ বিখ্যাত। সেগুলোর মধ্যে যদি বিখ্যাত কিছু কারণ তুলে ধরা হয় তাহলে দেখা যায়-
- মৈমনসিংহ গীতিকা: বাংলার লোকগানের এক অনন্য ধারা।
- মলুয়া: ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
- চন্দ্রাবতী: ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী গহনা।
- দেওয়ানা মদিনা: ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য।
- মুক্তাগাছার মন্ডার জন্য ময়মনসিংহ জেলা বিখ্যাত। এছাড়াও ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত জায়গা।
উপসংহার:
ময়মনসিংহের বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য জিনিস বলে শেষ করা যাবে না এবং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাও বলে শেষ করা যাবে না। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদীর সৌন্দর্য যেন ময়মনসিংহের প্রতিটি মানুষকে প্রতিনিয়তই মুগ্ধ করে।শুধু সৌন্দর্যের দিক বিচারেই নয় শিক্ষা,সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও ইতিহাসের দিক বিবেচনায়ও ময়মনসিংহ জেলা বিখ্যাত ও সেরা। বাংলাদেশের সব জেলাই কোনো না কোনো দিক দিয়ে অন্য জেলার তুলনায় বিখ্যাত বেশি। তেমনি ময়মনসিংহ জেলার বিখ্যাত জিনিস, বিষয়বস্তু ও ব্যক্তি বর্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আশা করি ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে আজকের আর্টিকেলটি ভালো লেগেছে। এই ধরনের বিভিন্ন আর্টিকেল ও তথ্য পেতে প্রতিদিন আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। পাঠক বিডি’র পাঠক হয়ে সাথে’ই থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।
ধন্যবাদ এত তথ্যের জন্য
আব্দুল আজিজ পিতার নাম