মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় ১৫২৬ সালে জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর এর মাধ্যমে। প্রাচীন কাল থেকে ভারতে রয়েছে ধন সম্পদ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার। ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ধন-সম্পদ দেখে প্রাচীনকাল থেকে নানা জাতি নানা সম্প্রদায় ভারতকে আক্রমণ করেছে। সিন্ধু, গঙ্গা , ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদ-নদী ভারত ভূমিকে করেছে সুফলা- সুজলা। প্রাচীন যুগে এসেছে আর্য, গ্রিক, কৃষান, শক, হূন মধ্যযুগে আরব, তুর্কি, আফগান মুঘল।
এশিয়ার বিখ্যাত সামরিক নেতা চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লঙ যথাক্রমে এয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে ভারত আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের ভারত অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীর প্রান্তরে যখন ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থা অরাজকতা ছিল তখনই ভারতে বিভিন্ন জাতি ভারত দখল করে ফেলে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে তুর্কি আফগান সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীর বিরুদ্ধে মধ্য এশিয়ার কাবুলের আমির বাবর এর বিজয়ের ফলে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান:
ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর। ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের নিকট ৩০০ বছরের স্থায়ী লোদী বংশের ধ্বংসই স্তূপের উপর নতুন রাজবংশের ঘোড়াপওন হয় তা হলো মোগল সাম্রাজ্য। বাবরের মুঘল সাম্রাজ্য জয়ের পর সাম্রাজ্য পরিচালিত হতে থাকে।
- বাবরের মৃত্যুর চার দিন পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসির মোহাম্মদ হুমায়ুন ১৫৩০ খ্রি ৩০ ডিসেম্বর সিংহাসনে আরোহন করেন।
- নাসির মোহাম্মদ হুমায়ন ১৫৩৯খ্রি চৌসার যুদ্ধ।১৫৪০ খ্রি বিলগ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধে পরজিত করে হুমায়ন কে দিল্লির মহাসনদ দখল করে। তিনি ৫ বছর রাজ্য পরিচালনা করে।
- দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধারের অব্যহিত পরই সম্রাট হুমায়ুন ১৫৫৬ খ্রি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বেই তার ছেলে সম্রাট আকবর কে রাজ্যের উত্তরসূরী করে গেছে।
- আকবর ১৫৫৬ খ্রি জালাল উদ্দিন মোঃ আকবর, উপাধি নিয়ে মুঘল সিংহাসনে অভিষিক্ত হন। আর বয়স ছিল তখন ১৩ বছর।
- সম্রাট আকবরের পুত্র নুরুল উদ্দিন মোঃ জাহাঙ্গীর ১৬০৬ খ্রি সম্রাট আকবরের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর ২৪ অক্টোবর নুরুল উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ (গাজী) উপাধি নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন। ১৬১১ খ্রিসম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে নুরজাহানের বিয়ে হয়। নুরজাহানের ছিল অসামান্য রূপ ও অসাধারণ গুণের অধিকারী। সর্বগুণে গুণান্বিত নুরজাহানের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও প্রগাঢ় সাধারণ জ্ঞান এবং শিল্প সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ।
- জাহাঙ্গীরের পুত্র ছিল সম্রাট শাহজাহান। জাহাঙ্গীর মৃত্যুর পর ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান মুঘল সিংহাসন আরোহন করেন।
- সম্রাট শাহজানের পুত্র ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্র আতরঙ্গজেব তাকে বন্দি করে ক্ষমতা দখল করে।
- ভারতের মুঘল রাজবংশের শেষ খ্যাতিমান সম্রাট ছিলেন মহিউদ্দিন মুহাম্মদ আলমগীর।
- শাহাজান ও মমতাজের তৃতীয় পুত্র। ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে আওরঙ্গজেব দক্ষিণাত্যের সুবেদার হিসেবে নিয়োগ লাভ করে।
সাম্রাজ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য:
- শেরশাহ: নির্মিত রাস্তা, সড়ক-ই আজম বা গ্রান্ড ট্রাক রোড। প্রায় ১৫শ মাইল দীর্ঘ।
- জাহাঙ্গীর: প্রজাদের অভিযোগ শুনে ৩০ গজ লম্বা একটি ঘন্টাযুক্ত ন্যায় শৃঙ্গল টাঙিয়ে দেন। Bale of Justice এবং chain of Justice নামে পরিচিত।
- শাহজাহান: মোগল সম্রাট শাহজাহানের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থাপত্য শিল্পী হচ্ছে তাজমহল। সম্রাট তার প্রিয়তমা পত্নী মমতাজের সমাজের উপর এই জগৎ বিখ্যাত ইমারতটি নির্মাণ করেন। তাজমহলের কাজ শুরু হয় ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে। ২০ হাজার দক্ষ শিল্পী ও বাইশ বছরের ফসল হিসেবে তাজমহল স্বপ্নদ্রষ্টা নিজেই।
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসন:
মুঘল সম্রাট ক্ষমতাশীন হলেও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দপ্তর সৃষ্টি ও যোগ্য কর্মচারী নিয়োগ করেন।
- খান-ই সামানের তত্ত্বাবধানে রাজকীয় পরিবার।
- প্রধান কাজির বিচার বিভাগ।
- ডাক চৌকির দারোগার অধীনে গুপ্তচর ও ডাক বিভাগ।
- মীর আতিশের তত্ত্বাবধানে গোলন্দাজ বিভাগ।
- একজন দারোগার অধিনে টাকশাল।
পুলিশ বাহিনী: শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হতো কোতোওয়ালের উপর।
- চৌর্য বৃত্তি নিরোধ।
- রাতে শহরে পাহারাদারের ব্যবস্থা।
- গুপ্তচরের মাধ্যমে দূর দূরান্তের খবরাখবর আরোহন।
- বেওয়ারির সম্পত্তির তালিকা প্রণয়ন।
রাজস্ব ব্যবস্থা: রাজস্ব বিভাগ দেওয়ান আলা-ই নামে পরিচিত ছিল এবং রাজ্যের প্রধান হিসাব রক্ষক হিসেবে মুসতাউফি অন্যান্য বিভাগের নিরক্ষন করতেন। আকবরের রাজত্বে তিন প্রকারের জমি ছিল।
- (ক) সরকারি ভূমি
- (খ) অভিজাত বর্গ
- (গ) করহীন জমি।
মুঘল সেনাবাহিনী প্রধানত ৫ ভাগে বিভক্ত করা ছিল। অশ্বারোহী, হস্তী বাহিনী, পদাতিক, গোলন্দাজ, নৌ বাহিনী।
মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্য তার উত্তর আধিকারী সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে বিস্তৃত ও গৌরবের চরম শিখরে আহরণ করে। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এর অবক্ষয় এবং ক্রমঅবনতি শুরু হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংঘটিত মহাবিদ্রোহ সিপাহী বিদ্রোহ নামে সমাধিক খ্যাত। নেতৃত্ব দানের অভিযোগে সর্বশেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বার্মার (মিয়ানমার বর্তমানে) রাজধানী রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াংগুন) নির্বাসন দেয়। ফলে ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পিছনে প্রাকৃতিক স্বাভাবিক নিয়ম উত্থানের পর পতন হয়। তবে এটাই শেষ কথা নয়। আওরঙ্গজেব দুর্বল মুঘল সম্রাট, এককেন্দ্রিক রাজতন্ত্র, সুষ্ঠু উত্তর অধিকার আইনের অভাব, অভিজাত বর্গের নৈতিক স্খলন, সাম্রাজ্যের বিশালতা, নীতি-আদর্শহীন রাজনীতি, সামরিক শক্তির অবনতি, নৌবাহিনী দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, হিন্দু জাগরণ, শিয়া-সুন্নি বিরোধ ইত্যাদি। বাহিক্য কারণ এর মধ্যে রয়েছে, পারস্য সম্রাট নাদির শাহ এবং শাসক আহমদ শাহ আবদালের আক্রমণ ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ প্রবৃত্তি।
মুঘল সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান পতন:
আমরা জানি, পৃথিবীতে যেমন সৃষ্টি হয়েছে তেমন ধ্বংস হয়েছে। তবে এই ধ্বংস বা পতন গুলো কিছু হয় প্রাকৃতিক কারণে কিছু হয় নিজস্ব কারণে। তবে কোন সভ্যতা এখন পর্যন্ত নিজ স্তম্ভে টিকে থাকতে পারেনি। তবে সভ্যতার দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে ভারত ছিল আশ্চর্য সৌন্দর্যের এক অধিকারী দেশ। বিভিন্ন জাতি, বিভিন্ন গোষ্ঠী, বিভিন্ন সম্প্রদায়, নানা সময়ে ভারতকে আক্রমণ করেছে এবং ভারতে বসতি স্থাপন করেছে। তবে এত সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে কয়েকটি কারণ বিদ্যমান ছিল।
- ভারতে ছিল ওঢেল ধন-সম্পদ।
- ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল মনোমুগ্ধকর
- ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থা অবনতি,
- ভারতের নিজস্ব জাতিদের মধ্যে বিবাদ।
এত জাতি আসার কারণে ঐতিহাসিক v. Smith ভারতকে বলেছে নৃতান্ত্রিক জাদুঘর।
মুঘল সাম্রাজ্য পতনের ফলাফল:
- মুঘল সাম্রাজ্য পতনের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ভারতবর্ষে ৩৩১ বছরের স্থায়ী ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মূলত সিপাহী বিদ্রোহের ফলেই মুঘলদের অবসান ঘটে।
- ১৭৫৭ সালে মুঘল শাসনের পতনের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষে রাজনীতির এক বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়। মুঘল শাসকেরা নামে বা মাত্র হলেও ভারতবর্ষের রাজনীতিতে ঐক্য স্থাপনের জন্য তাদের শেষ আশ্রয় মনে করা হতো। মুঘল রাজ বংশের পতনের মধ্যে দিয়ে তাও শেষ হয়ে যায়।
- মুঘল সমাজে নানা রকম কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল। যেমন সমাজের প্রচলিত বাল্যবিবাহ, পণ প্রথা, কৌলিন্য প্রথা, বিবাহ প্রথা ইত্যাদি। সম্রাট আকবর সতীদাহ ও বাল্যবিবাহ প্রথা নিরোধের চেষ্টা করেন, কিন্তু হিন্দু সমাজের গোড়ামির জন্য তার প্রয়াস ব্যর্থ হয়।
- সর্বোপরি, প্রায় ১৯০ বছরের জন্য সমগ্র ভারতবর্ষে পরাধীনতার বাঁধা পড়ে। এর মধ্যে দিয়ে ভারতের সংস্কৃতির ইতিহাসের ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।
- মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ফলে ভারত উপমহাদেশের মধ্যযুগের অবসান এবং আধুনিক যুগের উন্মেষ ঘটে। শিক্ষা দীক্ষা, বিজ্ঞান চেতনা ও প্রযুক্তিতে তথা আধুনিক আত্মার আর ভাবধারার উন্মেষ ঘটে।
- সম্রাট আওরঙ্গজেবের দক্ষিণাত্য নীতির চূড়ান্ত ফলাফল মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কে ত্বরান্বিত করে।
- ২৬ বছর যুদ্ধের ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। রাজনীতিতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের অনুপস্থিতে উত্তর মধ্য প্রদেশের মুঘল শাসন ব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়ে। এক কথায় আওরঙ্গজেব এর দক্ষিণাত্য নীতির সাম্রাজ্যের পক্ষে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
পরিশেষে
মুঘল শাসনের শেষের দিকে মারাঠা জাট, রাজপুত এবং সিকদারের মধ্যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। তা ছাড়া সম্রাট শাহজানের আমল থেকে সম্রাট আকবর কর্তৃক পর ধর্ম সহিষ্ণুতা ও প্রজাবর্গের সমান অধিকার পরিত্যক্ত হয়। জিজিয়া পুনঃপ্রবর্তন অমুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাগণকে মুঘল সাম্রাজ্যের ঘোর শত্রুতে পরিণত করে। এতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রসার উৎসারিত করে। এ সমস্ত কারণে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মুঘল সাম্রাজ্যের অবসানের ভারতবর্ষে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উন্মেষ ঘটে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ক্রমে ক্রমে নবজাগরণ দেখা দেয়। ধর্মীয় গোড়ামী হতে মুক্তি, জাতীয় আন্দোলনের সৃষ্টি প্রবৃত্তিতে এ নব চেতনার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
উল্লেখ্য যে, বহু বাধা – বিপত্তি, দুঃখ -দুর্দশা, নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের জাতীয় তথা স্বাধীনতার আন্দোলনের সাফল্যের পথে অগ্রসর হয়। এই আন্দোলনকে বাধা দেওয়ায় সাম্রাজ্যের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। রোবট আন্দোলনের মুখে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালে ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্র হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
প্রিয় পাঠক, আশা করছি সম্পূর্ণ আর্টিকেল পড়ে মুঘল সাম্রাজ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছেন।
Thanks 😊