স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন দেখা যায় আমাদের এই বাংলাদেশে। বাংলাদেশ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার নয়। যেমন বলা হয়, পাহাড়, সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল সবকিছু একসাথে পাওয়া যায় বাংলাদেশে। ঠিক তেমনি পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ অনন্য ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনাবলি, স্থাপনা এবং তাদের ইতিহাসের জন্য। ভাবলে অবাক হবেন, এই ছোট বদ্বীপে আছে হাজার বছরের পুরোনো অনেক বিখ্যাত রাজা, বিদেশী শাসন, বৃটিশ কলোনি সহ বিখ্যাত ভূপর্যটকদের পদচিহ্ন। আজ ইতিহাসের পদচিহ্নের পিছু নিয়ে আমরা জেনে নেবো ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলোর অবস্থান এবং বর্ণনা, যা ভ্রমণপিপাসুদের মন জুগিয়ে আসছে অনেক বছর ধরে।
লালবাগ কেল্লা
স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন এর মধ্যে মোগল আমলের অন্যতম নিদর্শন বলা হয় লালবাগ কেল্লা’কে। ধারণা করা হয়, লালবাগ নামক স্থানে তৈরি করা হয়েছে বলে এই কেল্লার নাম লালবাগ কেল্লা। কেল্লা অর্থ দূর্গ। আপনি যদি কেল্লার আশেপাশে পৌঁছে যান, দেখবেন বিশাল প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে ঠিক রাস্তার পাশে। ভেতরের কিছু চোখে পরছে না। প্রাচীরে ঘেরা এই কেল্লার প্রথমদিকে নাম ছিলো ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’।
ইতিহাসে লালবাগ কেল্লা
মোগল সম্রাট শাহাজাহান যিনি বিখ্যাত হয়ে আছে গ্রেট তাজমহলের জন্য, তার পুত্র ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। মোঘলরা তখন ভারতবর্ষ শাসন করছে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র হলেন আজম শাহ। আজম শাহ খুব অল্প সময়ের জন্য সম্রাট ছিলেন। তিনি ঢাকায় অবস্থানকালে, তার নির্দেশনায় ১৬৭৮ সালে প্রথবার শুরু হয় লালবাগ কেল্লার কাজ। শুরু হওয়ার ঠিক একবছর পর, আজম শাহ’কে দিল্লীতে ফিরতে হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে ডেকে পাঠান মারাঠে বিদ্রোহ দমন করার জন্য। আজম শাহ’র অনুপস্থিতিতে দূর্গের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দোলাচালে দুলতে থাকে কেল্লার ভবিষ্যত। কারণ সবাই ভাবছিলো আর শুরু হবে না কেল্লার কাজ।
আরো একবছর পরে সবার জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আবার শুরু হয় কেল্লা তৈরির কাজ। এবার কাজ শুরু করলেন নবাব শায়েস্তা খাঁ। বেশ তড়তড়িয়ে চলে গেলো চার বছর। কেল্লা তৈরিতে অবাধে খরচ করছিলেন নবাব। কারণ, নবাবের ইচ্ছা দূর্গটি উপহার দেবেন তার মেয়ে পরীবিবিকে৷ বিদেশী মার্বেল পাথর, কষ্টিপাথর আর রঙবেরঙের টালি দেদারসে ব্যবহার করা হচ্ছিলো দূর্গে। মানুষ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে এইসব দামী পাথরখচিত দূর্গের দিকে! কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো চারবছরের মাথায় থেমে গেলো দূর্গ তৈরির কাজ। এইবারের কারণ খুব করুণ। নবাবজাদী পরীবিবি মারা গেলেন অকালে! ভেঙে পড়লেন নবাব। অর্ধসমাপ্ত কেল্লাতেই সমাধিস্থ করা হলো পরীবিবিকে। তারপর আর কাজ হয়নি লালবাগ কেল্লার। অতটুকুতে রেখে দেওয়া হলো কেল্লা। যদিও গবেষকদের ধারণা, পরীবিবির দেহাবশেষ এখন আর লালবাগ কেল্লায় নেই৷ লোকমুখে শোনা যায় পরীবিবির সমাধিস্থলের গম্বুজটি নাকি একসময় সোনার পাতে মোড়ানো ছিলো।
বর্তমানে লালবাগ কেল্লা
লালবাগ কেল্লার তিনটি গেইটের একটি বর্তমানে জনসাধারণের জন্য খোলা। প্রধান ফটক পার হলে, প্রথমে চোখে পরবে পরীবিবির সমাধি। যে ভবনটিকে প্রায় আমরা টেলিভিশন বা বিভিন্ন চিত্রে দেখি। এর ছাদ কষ্ঠিপাথরে তৈরি৷ দেয়ালে দেয়ালে রঙবেরঙে টালি। সব দামী পাথরের দেখা পাওয়া যায় এই ভবনে। ১৬৮০ সালের আশপাশে এমন দূর্লভ পাথর জোগাড় করে, তারপর দক্ষ কারিগর দিয়ে সাজানো! কি পরিমাণ ধৈর্য, পরিশ্রম আর টাকা থাকতে হয় এমন কেল্লা বানাতে ভাবুন একবার। বর্তমানে পরীবিবির সমাধির একমাত্র গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে মোড়ানো।
এছাড়াও কেল্লার সীমানায় আরো দুটি স্থাপনা রয়েছে। তার একটি দরবার হল আর হাম্মাম খানা। মহিলাদের স্নানের জন্য হাম্মাম খানাটি বানানো হয়েছিলো৷ এছাড়া রয়েছে শাহী মসজিদ। আজম শাহ দিল্লি চলে যাওয়ার আগেই এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি যে কারো নজর কেড়ে নিবে। তার পাশে মোঘলদের তৈরি গোলাপ বাগানের নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
এই কেল্লা ঘিরে প্রচলিত কথাও কম নয়। প্রথমবার তৈরি শুরু হওয়ার পর আজম শাহ’র অল্পসময়ে সম্রাট পদ হারান। দ্বিতীয়বারে পরীবিবির জন্য তৈরি হচ্ছিলো যখন, তখন তিনি মারা গেলেন। কেল্লাটিকে অপয়া বলতো লোকে। পরে রটলো, কেল্লার ভেতর গোপন কক্ষে পরীবিবির ব্যবহৃত সোনাদানা মজুত আছে এখনও। তখন চোরের দৃষ্টি পরলো এই কেল্লার দিকে। এছাড়াও এই কেল্লায় ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু সুরঙ্গপথ। কিছু সুরঙ্গ বুড়িগঙ্গার দিকে গিয়েছে পালানোর পথ হিসেবে। আবার বেশকিছু সুরঙ্গের শেষ কোথায় কেউ জানে না। কারণ, কেউ বেঁচে ফিরতে পারেনি ওইসব সুরঙ্গ থেকে। তাই সিলগালা করে দেওয়া হয় প্রতিটা সুরঙ্গ। যাতে কোনো এ্যাডভেঞ্চারার অকালে প্রাণ না হারায়! মোঘল আমল থেকে অনেক উত্থানপতনের স্বাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে লালবাগ কেল্লা।
স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন ময়নামতি
বঙ্গদেশের অতি প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন ময়নামতি। ওখান থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ থেকে আন্দাজ করা হয় আনুমানিক ৩০০০ বছর পূর্ব থেকে এইখানে জনবসতি গড়ে উঠেছে। ময়নামতির পাহাড়ি অঞ্চলের সীমা উত্তর দক্ষিণে প্রায় ১৭ কিলোমিটার। তার একপাশে ময়নামতি পাহাড়, অন্যদিকে লালমাই পাহাড়। আর এর মধ্যবর্তী স্থানটি আনুমানিক ৬০০ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে উক্ত অঞ্চলের জ্ঞান এবং সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিলো। স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন এক নির্দশন হল এই ময়নামতি।
নামকরণ
বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ময়নামতি আর লালমাই পাহাড়ের পূর্বনাম ছিলো দেবপর্বত। এটি ছিলো পূর্বভারতের বৌদ্ধদের সংস্কৃতি এবং শাস্ত্র চর্চার কেন্দ্র। প্রত্ন নিদর্শন থেকে দেবপর্বতে পট্টিকেরা, জয়কর্মান্তবসাক নামক রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আনুমানিক দশম শতাব্দীর চন্দ্র বংশের রাজা মানিক চন্দ্রের স্ত্রী রাণী ময়নামতির নামানুসারে উক্ত অঞ্চলের নাম ময়নামতি রাখা হয়।
যুগে যুগে ময়নামতি
ময়নামতি-লালমাই পাহাড় একসময় প্রাচীন বাংলার সমতটের অংশ ছিলো। গুপ্ত বংশ উক্ত স্থান শাসন করতো আনুমানিক ৩২০ হতে ৫৫০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। এছাড়াও বিখ্যাত অনেক রাজবংশ এই অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলো। গোপচন্দ্র বংশ, খড়গ বংশ, রাত বংশ, দেব বংশ, পাল বংশ, সেন বংশ উক্ত জায়গার শাসন করেন। ১১ শতকের শেষভাগে বঙ্গের সমতটের রাজধানী বিক্রমপুরে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকেই ময়নামতির গুরুত্ব কমতে থাকে।
১২ শতকে সেন বংশের উত্থান হয় এবং ১৩ শতকের শেষভাগে বঙ্গের সমতট এবং হরিকেল রাজ্যের সাথে এই অঞ্চলটিও মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। রাজনৈতিক নৈরাজ্য এবং নিরাপত্তার অভাবে তখন থেকেই ধীরে ধীরে লোক কমতে শুরু করে এই অঞ্চলে। ওই সময়েই মূলত ময়নামতির ঐতিহ্য এবং স্থাপনাগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায় একসময়ের সংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্রগুলো এবং মাটিচাপা পরে স্থাপনাগুলো। এর পরবর্তী শতকে রাজত্ব করেন ত্রিপুরা রাজারা। ১৭৬৫ সালে এই অঞ্চল বৃটিশদের শাসনের অধীনে আসে এবং ১৭৯০ সালে গঠিত হয় ত্রিপুরা জেলা। সর্বশেষ, ১৯৬০ সালে পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে কুমিল্লা রাখা হয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান এবং দর্শনীয় স্থান
ময়নামতির হারানো ইতিহাস সবার দৃষ্টিগোচর হয় ইংরেজদের মাধ্যমে। ১৮৭৫ সালে শ্রমিকরা কাজ করছিলো রাস্তা তৈরি করার জন্য। এসময় তারা উন্মোচন করে একটি প্রাচীন বৌদ্ধমঠের। দিকে দিকে খবর ছড়িয়ে পরলে সবাই অবাক হয়ে যায়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এইখানে বৃটিশরা সেনাছাউনী স্থাপন করে। তখন তারা আরো কিছু নিদর্শন পায়। যুদ্ধ শেষ হলো। স্বাধীন হলো ভারত এবং পাকিস্তান। কুমিল্লা জেলা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশে পরলো। অবশেষে ১৯৫৫ সালে বৃটিশদের তত্ত্বাবধানে এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। তখন উন্মোচিত হয় এই প্রাচীন জনপদের বৌদ্ধমন্দির সহ বসবাসের স্থান, প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন এবং ইতিহাস! আনন্দ মঠ, ভবদেব মঠ, রূপবান মুড়া, কৌটিলা মুড়া হল অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা। বর্তমানে অন্যান্য প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত আছে ময়নামতি জাদুঘরে।
রাণী ময়নামতির গল্প
ইতিহাস পাঠের সাথে জড়িত থাকে অনেক রং বিরঙের গল্প। স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন এর ছোট একটি গল্প দিয়ে আজকের মতো এই লেখাটি শেষ করছি। আগেই উল্লেখ করেছি রাজা মানিক চন্দ্রের স্ত্রী ময়নামতির নামে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে। রাণী ময়নামতি ছোট থেকেই অসম্ভব রূপবতী এবং মেধাবী ছিলেন। তৎকালীন নিয়মানুসারে তিনি ছোটবেলাতে গুরু থেকে জ্যোতির্বিদ্যা এবং যোগসাধনার শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার মেধা এবং চর্চার ফলে তিনি এতই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন যে, মানুষের ভবিষ্যত গণনা করতে পারতেন।
একদিন তার ইচ্ছে হলো নিজের ভাগ্য গণনা করবেন। কিন্তু ভাগ্যগণনা করে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো! তিনি জানতে পারলেন, তার সন্তান হওয়ার পর ১৮ বছর বয়সেই মারা যাবে। ময়নামতি অনেক ভাবলেন এই সমস্যা থেকে উদ্ধার পেতে৷ সর্বশেষে তিনি কঠিন যোগধ্যানের দিকে মনোযোগী হলেন। দেবতাদের তুষ্ট করলে তারা ছেলের ভাগ্য বদলে দিলেন কিন্তু শর্ত দিলেন ১৮ বছর বয়সেই তাকে সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করতে হবে। যথাসময়ে রাণী ময়নামতি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। রাজা মানিক চন্দ্রের খুশি দেখে কে! আদর করে সন্তানের নাম দিলেন গোপীচাঁদ। বড় হয়ে উঠলো সে সবার আদরে। যথাসময়ে রাজা মানিক তাকে বিয়ে দিলেন রাজা হরিচন্দ্রের দুই মেয়ে অদুনা আর পদুনা’র সাথে।
ধীরে ধীরে গোপীচাঁদ ১৮ বছরে পদার্পণ করলেন। তার মাতা ময়নামতি উদ্বিগ্ন হলেন পুত্রের ভবিষ্যত নিয়ে। বয়স ১৮ হতেই ময়নামতি পুত্রকে নির্দেশ দিলেন সন্ন্যাস্য নিতে এবং বনে গিয়ে থাকতে। বাজ পরলো সবার মাথায়! রাজমাতা একি নির্দেশ দিলো পুত্রকে। অদুনা আর পদুনাতো রীতিমত বিদ্রোহ করলেন শ্বাশুড়ির সাথে, তাকে অসতী বলে কুৎসা রটালেন। রাজা মানিকচন্দ্র তখন ময়নামতিকে নির্দেশ দিলেন তার সতীত্ব পরীক্ষা দিতে। এই পরীক্ষায় তাকে নিক্ষেপ করা হলো ফুটন্ত গরম তেলের মাঝখানে। সতী ময়নামতি সুস্থদেহে ফেরত এলেন গরম তেলের কড়াই থেকে। ধন্য ধন্য করে উঠলো রাজ্য। রাজা মানিক চন্দ্র আর গোপীচাঁদ অনুতপ্ত হলেন। গোপী’র স্ত্রীদ্বয় ক্ষমা চাইলো ময়নামতি থেকে। এরপর গোপী বনবাসে যান। দীর্ঘসময় বনবাসে থেকে, শিক্ষাগ্রহণ করে ফেরত আসেন রাজ্যে। তারপর! সুখে-শান্তিতে রাজ্য শাসন এবং প্রজাপালন করলেন আমৃত্যু।
সুন্দর তথ্য তুলে ধরেছেন।