রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম অবিচ্ছেদ্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই দুই নামের প্রতিধ্বনিতে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে আমাদের অজান্তে মনের কোণে জেগে ওঠে এক অপরূপ আনন্দানুভূতি। প্রেমে-বিরহে-বিদ্রোহে, তাই আজও বাঙ্গালীর হৃদয়ে চিরায়মান ‘অগ্নিবীণা’র ঝঙ্কার আর ‘গীতাঞ্জলী’র সুর ।
রবীন্দ্রনাথের “এসো হে বৈশাখ” গান ছাড়া দুই বাংলার নববর্ষ যেমন অপূর্ণ থেকে যায়, তেমনই নজরুলের “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”-এই কালজয়ী গান ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায় দুই বাংলার ঈদ! রবীন্দ্রনাথ তো শুধু দুই বাংলার নন, তিনি আমাদের ‘বিশ্বকবি। অন্যদিকে, নজরুলের জন্মস্থান ভারতে হলেও তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে ‘জাতীয় কবি’-র স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এঁরা দু’জনেই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাঁদের সাহিত্য ও গান বাংলা ও বাঙালির অন্যোন্য সম্পদ। বাংলা সাহিত্যের দুই মহান কবির মধ্যে ছিল এক গভীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সুসম্পর্ক।
দুই মহামানবের মিল-অমিল-
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বয়সের ব্যবধান ৩৮ বছরের। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩-তে ৫২ বছর বয়সে যখন নোবেল পুরস্কার পান, তখন মাত্র ১৪ বছরের বালক দুখু মিঞা (নজরুল), গ্রামগঞ্জে লেটো দলে গান গেয়ে, মসজিদে বালক ইমামের কাজ করে অর্থ উপার্জন করছেন।
কিন্তু এই দুই কবি পরস্পরের অত্যন্ত আপনার জন ছিলেন; এবং সে নৈকট্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দু’জনেরই প্রধান পরিচয় মূলত কবি হলেও, তাঁরা দু’জনেই ছিলেন বহুমুখী। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁরা যেমন সমানভাবে বিরাজমান ছিলেন, ঠিক তেমনই দেশের রাজনীতির সঙ্গেও ছিলো তাঁদের সমান যোগ। সমাজের অগ্রগতি ও মানুষের মুক্তি নিয়ে তাঁদের চিন্তা ছিল সার্বক্ষণিক।
দুই কবির বংশমর্যাদা ছিল ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ঐশ্বর্যশালী ও ইংরেজ-আশীর্বাদপুষ্ট অভিজাত পরিবারে। জমিদারীও তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর রচিত “জনগণমন অধিনায়ক” ভারতের ও “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, এভাবেই তিনি আমাদের দুই বাংলার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
অন্যদিকে নজরুলের জন্ম ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে বর্ধমানের চুরুলিয়ায়, এক দীনহীন পরিবারে। স্কুলের বাধাধরা পড়াশোনা রবীন্দ্রনাথের যেমন পছন্দ ছিল না, নজরুলেরও স্কুলের পড়া শেষ করা সম্ভব হয়নি, ভিন্ন কারণে— পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৭ বছর বয়সে করাচির ৮৯নং বাঙালি পল্টনে তিনি যোগদান করেন। তাঁর অসীম সাহস ক্রমশ তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল।
বিশ্বকবি ‘মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন বিভা’, বিশ্ব মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ; অন্যদিকে নজরুল তুখোড় জাতীয়তাবাদী, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, আবার একই সঙ্গে উদ্দাম প্রেমিক—’মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণ-তূর্য’। রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষে শিশু তার মা’কে পাহারা দেয়, ডাকাত বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে রক্ষা করে তার মাকে; অন্যদিকে, নজরুলের শিশু রাত্রিশেষে কেবল মা নয়, জাগাতে চায় সবাইকে, সবাই না জাগলে সকাল হবে কি করে? রবীন্দ্রনাথের শিশুটি যদি হয় জাতীয়তাবাদী বীর, তবে নজরুলের শিশু সমাজতন্ত্রীদের দলভুক্ত। রবীন্দ্রনাথের উপেনের তবু দু বিঘে জমি ছিল, নজরুলের কৃষকের কোনো জায়গা-জমিই নেই, তারা নিতান্ত কুলি-মজুর।
গদ্য, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ- সব ধরনের রচনাতেই ছিল এই দুই মহামানবের সাবলীল বিচরণ।তাঁ রা বক্তৃতা দিয়েছেন সভা-সমাবেশে, যুক্ত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে, যদিও সমমাত্রায় নয়। দু’জনেরই ব্যক্তিগত জীবনে দুঃসহ দুঃখ ছিল, কিন্তু সেই দুঃখ তাঁদের স্তব্ধ করতে পারেনি। আত্মকেন্দ্রিক করেনি, বরং দুঃখকে তাঁরা মূর্ত করেছেন তাঁদের লেখায়। তাঁরা দু’জনেই নাটক লিখেছেন, নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয় করেছেন। তাঁদের ছিল কৌতুকের অসাধারণ বোধ, এবং তাঁরা শিশুদের জন্য যা লিখেছেন তাও অতুলনীয়। শুধু কিছু ক্ষেত্রে নজরুলকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন রবি ঠাকুর। চিত্রাঙ্কন, বিদেশ-ভ্রমণ আর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা। তবে তুলনামূলকভাবে, নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন খুবই সংকীর্ণ, মাত্র ২২ বছর। রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল জীবনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
সঙ্গীত প্রতিভা-
রবীন্দ্রনাথের মতোই নজরুলেরও ছিল সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে দু’জনের অবদানই অসামান্য। হাজার হাজার গানে তাঁরা রেখে গেছেন তাঁদের চিরন্তন প্রভাব। তাঁরা সুর সৃষ্টি করেছেন, সুরের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এমনকি তাঁরা নিজেরাও ছিলেন সুগায়ক। বাংলা সাহিত্যে অন্য কোনো দু’জন কবি আমরা পাইনি যাঁরা সঙ্গীতে এতটা দক্ষ এবং এমন নিবিড়ভাবে সঙ্গীতমনস্ক ছিলেন। তাঁদের সব লেখাতেই, সে পদ্যই হোক বা গদ্য, গান আছে। কবিতার সঙ্গে সঙ্গীতের এমন মৈত্রী তাঁদের দু’জনের বাইরে অন্য কোনো বাঙালী কবির রচনাতে পাওয়া যায় না।
রবীন্দ্রনাথের মতে, “বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে।” এ কথা যে কতখানি সত্যি তা আমরা, অর্থাৎ দুই বাংলার সাহিত্য-প্রেমী মানুষরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করি।
নিজেদের সঙ্গীত সম্পর্কিত তাঁদের ব্যক্তিগত মতামতের মধ্যেও এক অদ্ভুত সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। রবি ঠাকুরকে আমরা কবিগুরু বা বিশ্বকবি বললেও, তিনি কিন্তু তাঁর সঙ্গীতকেই এগিয়ে রাখতেন তাঁর কবিতার চেয়ে, বলতেন,’তোমরা কবি টবি যা বলো বলতে পারো,কিন্তু গানেই আমি বড়।’ অন্যদিকে ঠিক একইভাবে বিদ্রোহী কবিও একবার জনসাহিত্য সংসদের ভাষণে বলেন,’সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই,তবে এইটুকু মনে আছে,সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।’
জীবনে এমন কোনও মুহূর্ত নেই, যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রাসঙ্গিক নয়। নজরুল গীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
বসন্ত সমাগমে প্রেমের অনুভূতিতে ভানুসিংহের পদাবলীতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
”বসন্ত আওল রে!
মধুকর গুন গুন,অমুয়ামঞ্জরী কানন ছাওল রে।
শুন শুন সজনী,হৃদয় প্রাণ মম হরখে আকুল ভেল,
জর জর রিঝসে দুঃখদহন সব দূর দূর চলি গেল।”
আবার ঠিক একই প্রসঙ্গে একই অনুভূতির অনুরণন আমরা পাই নজরুলগীতিতেও-
“বসন্ত আজ আসল ধরায়
ফুল ফুটেছে বনে বনে।
শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায়
ফাল্গুনী মোর মন-বনে।
ফুলগুলি হায় ঝরেছিল
হিমেল হাওয়ার পরশনে।
দখিন হাওয়ার হিল্লোলে আজ
প্রিয়তমের স্পর্শ নে!”
বিরহ অনুভুতির প্রকাশ যেমন রবি-গানের প্রতিটি ছত্রে-
“আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন তোমাতে করিব বাস,
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।
যদি আর-কারে ভালোবাস,
যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও,
আমি যত দুখ পাই গো॥”
অন্যদিকে নজরুলের অনিন্দ্যসুন্দর বিরহগীতির প্রতিটি পঙক্তিতে অনুরণিত হয়েছে এই একই অনুভূতি
“তোমার বঁধু পাশে (হায়) যদি রয়,
মোরও প্রিয় সে, করিও না ভয়,
কহিব তা’রে, ‘আমার প্রিয়ারে আমারো অধিক ভালোবাসিও’॥
বিরহ-বিধুর মোরে হেরিয়া,
ব্যথা যদি পাও যাব সরিয়া,
রব না হ’য়ে পথের কাঁটা, মাগিব এ বর মোরে ভুলিও ॥”
| Chat GPT কি? চ্যাট জিপিটি থেকে অর্থ উপার্জনের সহজ পদ্ধতি |
এছাড়া, রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গানের প্যারডি রচনা করেন নজরুল। যেমন ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথের –
“আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো নমো হে নমো
তোমায় স্মরি হে নিরুপম
নৃত্য রসে চিত্ত মম,উচ্ছল হ’য়ে বাজে।”
রবিগানের প্রেম ও পুজার মিশ্রণ, নজরুলের প্যারডির হাস্যরসে হল-
”ওহে,শ্যামো হে শ্যামো নামো হে নামো
কদম্বডাল ছাইড়া নামো
দুপুর রোদে বৃথা ঘামো—ব্যস্ত রাধা কাজে।”
আবার আমাদের অতি পরিচিত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত,
”আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’
তুমি থাক সিন্ধুপারে ওগো বিদেশিনী।।
তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতে,তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে,
তোমায় দেখেছি হৃদি-মাঝারে ওগো বিদেশিনী।।”
নজরুলের প্যারডির গানে এই প্রেমভাব পরিণত হয়েছে এক ঐশ্বরিক প্রেমে-
“বিদেশিনী চিনি চিনি-
চিনি চিনি ওই চরণের নূপুর রিনিঝিনি।।
দ্বীপ জ্বলে ওঠে পাথর তলে
তোমার চরণ ছন্দে,
নাচে গাঙচিল সিন্ধু কপোত
তোমার সুরে আনন্দে।”
রবীন্দ্র- নজরুল সম্পর্ক
নজরুল ছেলেবেলা থেকেই রবীন্দ্র-প্রেমী ছিলেন। নানান জায়গায় তিনি রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে বেড়াতেন, এমনকি করাচি সেনানিবাসে থাকার সময়েও নজরুল সবসময় রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন। তিনি ছিলেন রবীন্দ্র-গানের ভাণ্ডারী। সে-কারণে পল্টনের সকলে তাঁকে ‘রবীন্দ্র-সংগীতের হাফিজ’ বলে ডাকতেন।
পরবর্তীতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম এর সম্পর্ক ছিল গুরুশিষ্যের মতো! তাই তো নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকার জন্য কবিগুরু আশীর্বচন লিখে দিয়েছিলেন। পরে নজরুলের নবযুগ, লাঙল পত্রিকার জন্যও নজরুল লিখেছিলেন। তাঁরা দুজনেই ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদের কবিতায়। নজরুল লিখেছেন, ‘“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?’ অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব;/ ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ’।
নজরুল যখন জেলে, রবীন্দ্রনাথ ‘বসন্ত’ নাটকটি উৎসর্গ করলেন বিদ্রোহী কবিকে। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিরূপ হলেন, রবীন্দ্রনাথ অনড়! তিনি বললেন, জাতির জীবনে বসন্ত এনেছেন নজরুল, তাই এ নাটকটি তাঁকেই উৎসর্গ করা যথোচিত হবে। জেলে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম এর স্বাক্ষরসহ নাটকটি পেলেন, এই সম্মান আর প্রাপ্তি তাঁর জেলজীবনের যন্ত্রণায় যেন খানিক স্নেহের প্রলেপ বুলিয়ে দিল।
এইভাবেই অনুজ নজরুলের প্রতি ছিল অগ্রজ রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ এবং অগ্রজের প্রতি ছিল অনুজের শ্রদ্ধা ও ভক্তি। রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন , “আজি হতে শতবর্ষ পরে / কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতুহলভরে, …”, উত্তরে নজরুল লিখেছেন , “আজি হ’তে শতবর্ষ আগে / কে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদেরে / শত অনুরাগে…”।
| আসল Vidmate Apk Download করুন খুব সহজেই |
একবারই তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করা হয়েছিল। রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নজরুল-কবিতায় ‘রক্তে’র পরিবর্তে ‘খুন’ শব্দের প্রয়োগ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করেছেন।
নজরুল এই রটনায় খুবই ব্যথিত হলেন। কারণ রবীন্দ্রনাথ তো বিদ্রোহী কবির আরবি-ফারসি ব্যবহারের প্রশংসা করতেন, তবে? গভীর দুঃখে তিনি লিখলেন, ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে এমন কথা বলেনই নি। সবটাই ছিল রটনা। রবীন্দ্রনাথও ব্যথিত হয়েছিলেন, বলেছিলেন, নজরুল কেন এমন রটনা বিশ্বাস করলেন? তাঁদের সুদীর্ঘ ২১ বছরের সম্পর্কে এই একটি অভিমান পর্ব ছাড়া আর কোথাও কোনো মালিন্যের ছোঁয়া ছিল না।
আরেকটি ঘটনার কথা বলি, রবীন্দ্র-নাটক ‘গোরা’’ যখন চলচ্চিত্রায়িত হলো, নজরুল ছিলেন তার সঙ্গীত পরিচালক। সেখানে রবীন্দ্রগান ব্যবহার নিয়ে আপত্তি তোলে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত সমিতি। কিন্তু ছবির প্রযোজক আর প্রোজেক্টর নিয়ে নজরুল যখন হাজির হন কবিগুরুর কাছে, ছবিটি তাঁকে দেখিয়ে তাঁর অনুমতি নিতে, ভ্রাতৃপ্রতিম কবিকে দেখে আনন্দবিহ্বল হয়ে ছবি না দেখেই রবীন্দ্রনাথ অনুমোদন-পত্রে সই করে দেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর গান নজরুলের পরিচালনায় যথাযোগ্য সম্মানেই ব্যবহৃত হবে।
এইভাবেই ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে তাঁদের সম্পর্কের মাধুর্য। আত্মার টানে, অগ্রজের ৮০তম জন্মজয়ন্তীতে অনুজ লিখলেন কবিতা ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’, এই আশঙ্কায় যে কবিকে আরেকবার শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ হয়তো আর তিনি নাও পেতে পারেন, আর তাঁর সে আশঙ্কা সত্য করে সে বছরই ঘটে বিশ্বকবির মহাপ্রয়াণ। শোকে বিহ্বল নজরুল সেই দিনই লিখলেন ‘রবিহারা’ কবিতা যা তিনি আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে আবৃত্তি করেন,
‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপথের কোলে
শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে
উদাস গগনতলে
বিশ্বের রবি ভারতের কবি
শ্যাম-বাংলার হৃদয়ের ছবি
তুমি চলে যাবে বলে’।
বেতারে এই কবিতাটি আবৃত্তি করার সময়ে নজরুল হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আবৃত্তি তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি, তাঁর জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে একটি গান রচনা করে সুর দিলেন –
“ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত কবিরে, জাগায়ো না জাগায়ো না”।
আর এই মহাপ্রয়ানের এক বছর পরই নজরুল অসুস্থ হয়ে চিরতরে নির্বাক হয়ে যান , ডুবে যান বিস্মরণের অতল-গভীরে।
উপসংহার-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনচর্চা ও জীবনবোধ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবু বাক্য ও শব্দচয়নে অগ্রজের সাথে অনুজের সাযুজ্যে রয়েছে এক অনবদ্য যুগলবন্দী।
রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করে, তাঁর লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়ে, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সামনের দিকে ভিন্ন এক পথ ধরে এগিয়েছেন নজরুল। তাই তো তিনি বলছেন,
“একা তুমি জানিতে হে কবি, মহাঋষি,
তোমারি বিচ্যুত-ছটা আমি ধূমকেতু।”
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা বা গবেষণা হয়েছে অগুন্তি, আগের তুলনায় বেড়েছে নজরুলচর্চা ও গবেষণা ও। তারই সুত্র ধরে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দুই কবিশ্রেষ্ঠ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা আজও স্বমহিমায় ভাস্বর।
শুধু প্রার্থনা এই, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’, আমাদের আগামী প্রজন্ম যেন বিদেশী ভাষায় শিক্ষিত হয়ে বিস্মৃত না হয় আমাদের প্রাণের ভাষার দুই মরমী দিকদ্রষ্টার মহান সৃষ্টিকে। আমাদের অন্তরাত্মার আর্তি, এই অপরূপ সাহিত্যকীর্তি যেন প্রবাহমান ধারার মতো বয়ে চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এইভাবেই এ পৃথিবীতে যতদিন বাঙালির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন যেন তাঁদের হৃদয়ে জ্বাজ্বল্যমান প্রদীপের শিখার মতো শোভা পান চেতনার দুই কূল, রবীন্দ্র-নজরুল।
লিখেছেন-
ডঃ দীপা মিত্র,
অধ্যাপিকা,
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট,
কলকাতা, ভারত।
আশা করি আজকের আর্টিকেলটি ভালো লেগেছে। এই ধরনের বিভিন্ন আর্টিকেল ও তথ্য পেতে প্রতিদিন আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। পাঠক বিডি’র পাঠক হয়ে সাথে’ই থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।