কুমিল্লা জেলার পরিচয়, ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

কুমিল্লা জেলার ভৌগলিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় পার্গিটার রচিত পূর্ব – ভারতীয় দেশসমূহের প্রাচীনকালের মানচিত্রে। এই মানচিত্রে আজকের বাংলাদেশের এই অঞ্চলের দক্ষিণে সাগরনূপের, উত্তরে প্রাগজ্যোতিষ ও কিরাতসের অবস্থান চিহ্নিত রয়েছে। 

আকৃতিঃ

জেলাটি মোটামুটি ভাবে ত্রিভূজাকৃতির। দক্ষিণ দিক প্রশস্ত,  উত্তর দিক সরু এবং এর মাথা পূর্ব দিকে খানিকটা ঝুকেঁ পড়েছে। মেঘনা সমভূমি হতে ত্রিপুরা পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। সমুদ্রতীর থেকে ত্রিপুরা পাহাড়ের পাদদেশের গড় উচ্চতা প্রায় পঁচিশ ফুট,  আর মেঘনা সমভূমির পশ্চিম ভাগের গড় উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট। 
এ সমভূমির অধিকাংশ এলাকাই বর্ষাকালে পাঁচ থেকে দশ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বর্ষায় পানির নিচে থাকলে ও এ সমভূমিতে ততটা পলি জমেনা। কারন মেঘনার পানি ততটা পলি বহন করে আনেনা। কিন্তু এ নিমজ্জিত মৃত্তিকা বেশকিছু কাল সিক্ত থাকার দরুন ভালভাবে চাষের উপযোগী হয়। 

জলবায়ুঃ

কর্কট ক্রান্তি রেখা কুমিল্লা জেলার উপর দিয়ে অতিক্রম করার জন্য এ জেলা ক্রান্তীয় অঞ্চলের অর্ন্তভূক্ত। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এখানে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু পরিলক্ষিত হয়। এখানে বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ৮০ ইঞ্চি হতে ১২০ ইঞ্চি। শীতকালে বৃ্ষ্টিপাত খুবই কম, এক রকম হয়না বললেও চলে। জেলার গড়তাপ ৭৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট। মে মাসে তাপমাত্রার গড় ৮৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট নামে। শীতকালে জানুয়ারী মাসের গড় ৬৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট নামে। তবে এপ্রিল-মে মাসে কখনও তাপমাত্রা ১০৭ ডিগ্রী ফরেনহাইট হয় আর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত কখনও তা ৪৫ ডিগ্রী থেকে ৪২ডিগ্রী ফারেনহাইট এ নামে ।

আয়তন ও অবস্থানঃ

কুমিল্লা জেলা ২৩°০১’ থেকে ২৩°৪৭’ ৩৬” উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯০°৩৯’ থেকে ৯১°২২’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে বিস্তৃত। কর্কটক্রান্তি রেখা কুমিল্লা জেলা অতিক্রম করেছে। কুমিল্লা জেলার উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, দক্ষিণে ফেনী ও নোয়াখালী জেলা, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমে চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলা। এ জেলার আয়তন ৩০৮৭.৩৩ বর্গ কিলোমিটার। আর আন্তর্জাতিক সীমান্ত দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার।

প্রশাসনিক কাঠামোঃ

কুমিল্লা জেলায় ১৭টি উপজেলা, ১১ টি সংসদীয় আসন, ১৯৩ টি ইউনিয়ন, ৩,৬৮৭ টি গ্রাম, ১৭২ টি ভূমি অফিস, ৩৫৭ টি হাট বাজার, একটি সিটি কর্পোরেশন, ৮ টি পৌরসভা এবং ২৭০০ টি মৌজা বিদ্যমান। কুমিল্লার ১৭ টি উপজেলার মধ্যে রয়েছে আদর্শ সদর, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, বরুড়া, নাংগলকোট, মনোহরগঞ্জ, চান্দিনা, তিতাস, দাউদকান্দি, হোমনা, মেঘনা, মুরাদনগর, দেবিদ্বার, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও লালমাই। এখানকার সিটি কর্পোরেশনের নাম কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০/০৭/২০১১খ্রিঃ এবং আয়তন ৫৩.০৪ বর্গ কিলোমিটার, ওয়ার্ড সংখ্যা ২৭টি। জনসংখ্যা ৩,৩৯,১৩৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ এর সংখ্যা ১,৭৭,৩০০ জন ও মহিলা ১,৬১,৮৩৩ জন (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী)।

নামের ইতিহাসঃ

কুমিল্লা শব্দটি উক্ত অঞ্চলের আদিনাম কমলাঙ্ক (চীনা পরিব্রাজক ওয়াং চুয়াং-এর মতে, কিয়া-মল-ঙ্কিয়া) এর ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত আঞ্চলিক অপভ্রংশ রূপ, যার অর্থ পদ্মফুলের দীঘি। কুমিল্লা অঞ্চলটি একসময় প্রাচীন সমতট অঞ্চলের অধীনে ছিল। পরবর্তীকালে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে যোগ দেয়।

অর্থনীতিঃ

কুমিল্লা জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক। এ অঞ্চলের দারিদ্রতার হার ২০.৬%। এই জেলার অর্থনীতি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে কৃষির মাধ্যমে। এ জেলার প্রায় ১১.৬% মানুষ ব্যবসার সাথে জড়িত। 

প্রাকৃতিক সম্পদঃ

কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। বৃহত্তর লাকসাম উপজেলার জলাঞ্চল হিসেবে খ্যাত দক্ষিণ অঞ্চলের ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি ২০০৫ সালে গঠিত। ডাকাতিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এ উপজেলা এক সময় ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান হতে জাহাজে করে, নৌকায় করে পাটসহ অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য ডাকাতিয়া নদী পথে চাঁদপুর হয়ে নারায়নগঞ্জ ও ঢাকায় প্রেরণ করা হত। কালের বিবর্তণে সেসব আজ বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার সাধারন জনগণ কৃষি-কাজ, মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। এ উপজেলায় প্রাকৃতিক সম্পদের কোন ক্ষেত্র যেমন- তেল, গ্যাস বা কয়লা খনি পাওয়া যায়নি। এলাকার জনসাধারন কৃষিজাত পণ্য, শস্য উৎপাদন এবং মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে।

বনজ সম্পদঃ

এক কালে লালমাই – ময়নামতি পাহাড়ী অঞ্চলে প্রচুর বনজ সম্পদ ছিল। এখন নেই বললেও চলে। কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা এবং চৌদ্দগ্রাম থানার কিছু অংশে কিছু কিছু বনজ সম্পদ দেখা যায়। তবে জলবায়ুর উষ্ণতা ও আর্দ্রতা, পলি গঠিত মৃত্তিকার উর্বরতা এবং অন্যান্য কারনে এ জেলার উদ্ভিদের যথেষ্ট প্রাচুর্য দেখা যায়।

নদ – নদীঃ

কুমিল্লা জেলার প্রধান নদ-নদীগুলো হল: মেঘনা নদী, গোমতী নদী, তিতাস নদী, ডাকাতিয়া নদী, কাঁকড়ি নদী, ছোট ফেনী নদী, আড়চি নদী, ঘুংঘুর নদী এবং সালদা নদী। কুমিল্লায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী রয়েছে । এখানে অন্যতম প্রধান নদী গোমতী। ডাকাতিয়া, কাঁকরী নামে আরো দুটি নদী ও রয়েছে। এর মধ্যে ডাকাতিয়া নতুন ও কাঁকরী প্রাচীন নদী। গোমতীর উৎপত্তি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ী এলাকায়। গোমতীর দৈর্ঘ্য ১৩০.১২২ কিলোমিটার। এটি কুমিল্লার সদর, বুড়িচং, ব্রা্হ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দাউদকান্দি হয়ে  মেঘনায় মিলেছে। গোমতীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাম তীরে ৩৪.৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে।

যে কারণে বিখ্যাতঃ

কুমিল্লা জেলা যার আদিনাম কমলাঙ্ক এর অপভ্রংশ এবং এর অর্থ পদ্মফুলের দীঘি। বাংলাদেশের দক্ষিণ – পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ও মহানগরী। এটি ঢাকা থেকে ৯৬ কিলোমিটার ও চট্টগ্রাম থেকে ১৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । খাদি কাপড় ও রসমালাইয়ের জন্য বিখ্যাত।

দর্শনীয় স্থানঃ

কুমিল্লার পর্যটন আকর্ষণ গুলোর মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হয় বাংলাদেশ। আজকের আর্টিকেলটি এই গুরুত্বপূর্ণ জেলা কুমিল্লার দশটি প্রসিদ্ধ দর্শনীয় স্থান নিয়ে।

১। শালবন বৌদ্ধ বিহারঃ

এক সময়কার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের প্রধান উপাসনালয় শালবন বৌদ্ধ বিহারের অবস্থান কুমিল্লার কোটবাড়িতে। এখানকার বনে প্রচুর পরিমাণে শাল গাছ থাকায় স্বভাবতই বিহারটির শালবন বিহার নাম হয়েছে। বিহারে মোট ১৫৫টি কক্ষ আছে, যেখানে ধর্মচর্চা করতেন বুদ্ধের অনুসারিরা।

২। ময়নামতি জাদুঘরঃ

কুমিল্লার ঐতিহাসিক নিদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা এই ময়নামতি জাদুঘর, যার অবস্থান কুমিল্লা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সালমানপুরে। জাদুঘরের ৪২ টি ভিন্ন ভিন্ন সংরক্ষণাগার ঘুরে দেখার সময় চোখে পড়বে ব্রোঞ্জ ও পাথরের ছোট-বড় মূর্তি, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, ব্রোঞ্জের বিশাল ঘণ্টা, পোড়ামাটির ফলক, মাটির খেলনা, কাঠের পুরানো জিনিসপত্র, মৃৎশিল্প সামগ্রী এবং প্রাচীন হাতে লেখা পান্ডুলিপি।

৩। ধর্মসাগর দীঘিঃ

কুমিল্লা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই দর্শনীয় স্থানটি। আঙ্গিনায় ঢুকতেই দেখা যায় একটি সাইনবোর্ড, যেখানে লেখা আছে এই দীঘির ইতিহাস। ১৭৫০ থেকে ১৮০৮ সালে রাজা ধর্মপালের শাসনামলে রাজ্যে এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন পাল বংশের এই জনদরদী রাজা প্রজাদের কষ্ট দূর করার জন্য খনন করে দেন ধর্মসাগর দীঘিটি। অতঃপর তার নামেই দীঘিটি প্রসিদ্ধি লাভ করে।

৪। ইটাখোলা মুড়াঃ

কোটবাড়ির এই স্থানটি মূলত সপ্তম বা অষ্টম শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ বিহার। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে ইট পোড়ানো হয় বিধায় জায়গাটির নাম হয়েছে ইটাখোলা মুড়া। ইটাখোলা মুড়া থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে আঠারো তোলা ওজনের স্বর্ণ, রৌপ্য মুদ্রা, মাটির পাতিলে রক্ষিত সোনার বল, ধ্যাণী বুদ্ধ মূর্তির আবক্ষ অংশ, তাম্রশাসন, মাটির ফলকলিপি, ধাতব ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্য, ধাতব ধ্যানীবুদ্ধ অমিতাভ, অলংকৃত পোড়া মাটির ফলক, গণেশ মূর্তি ও তেলের প্রদীপ।

৫। রূপবান মুড়াঃ

কোটবাড়িতে ইটাখোলা মুড়ার ঠিক উল্টো পাশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটির নাম রূপবান মুড়া। রহিম ও রূপবানের ভালোবাসার কিংবদন্তিতে প্রচলিত আছে এই ঐতিহাসিক স্থান ঘিরে। নব্বই এর দশকে কুমিল্লা-কালিবাজার সড়কের কাছে আবিষ্কৃত হয় এই প্রত্নস্থানটি। এখানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গঃ

কুমিল্লা জেলার ব্যক্তিবর্গের এই তালিকায় বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায় জন্ম নিয়েছেন বা বসবাস করেছেন কিংবা পৈত্রিক নিবাস এখানে এমন ব্যক্তিদের নাম সন্নিবেশ করা হয়েছে।
১। আতিকুল ইসলামঃ
 নির্বাচিত মেয়র, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।
২। মোহাম্মদ আবুল হাশেম:
 বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ।
৩। আঞ্জুম সুলতানা সীমা:
 বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ।
৪। আনওয়ারুল আজিম:
রাজনীতিবিদ।
৫। আ হ ম মোস্তফা কামাল:
 বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ও আইসিসির প্রাক্তন সভাপতি।
৬। আ. ক. ম. বাহাউদ্দিন বাহার:
বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ।
৭। খন্দকার মোশতাক আহমেদ:
খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯১৯ সালের ৫ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৬  সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
৮। কাজী জাফর আহমেদ:
কাজী জাফর আহমেদ ১ জুলাই ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন  এবং ২৭ আগস্ট ২০১৫ সালে মারা যান। তিনি  ছিলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ।
কুমিল্লা শহর একটি বিভাগ কেন্দ্রীক শহর। এই জেলার আশেপাশের জেলাগুলো থেকে অনেক লোকজন কুমিল্লায় আসেন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে। এছাড়াও কুমিল্লা শহরের ৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বিবির বাজার স্থলবন্দর। ডিজিটাল জনশুমারী ও গৃহগণনা- ২০২২ অনুযায়ী কুমিল্লা আয়তন এবং জনসংখ্যায় দেশের ১১তম বৃহত্তর মহানগর।

গুগল নিউজে পড়ুন- পাঠক বিডি

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com