চিতা বহ্নিমান (PDF)

চিতা বহ্নিমান 
ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায় 

প্রথম কথা:

বইটি তপতী নামের ধনীর দুলালী এবং দরিদ্র ঘরের ছেলে তপনকে কেন্দ্র করে লেখা। গল্পে তপতীর বিলাসিতার অনেক বর্ণনা রয়েছে৷ এতো বড় বাড়ির মেয়ের এতো অহংকার এর বিবরণ শুনে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। আর অন্যদিকে রয়েছে তপন, যার কোনো সহায় সম্বল না থাকলেও আত্নমর্যাদা অনেক বড়লোকের চাইতেও অনেক উপরে। তপনের তুলনা তপন নিজেই।
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় এর লিখা চিতা বহ্নিমান, শাপমোচন, ফুলশয্যার রাত বই গুলো বেশ সাড়া ফেলেছিল এক সময়। তিনি ছিলেন একসময়কার বিখ্যাত বাঙালি লেখক, তার আসল নাম তারাপদ। 

কাহিনি সংক্ষেপ :

তপতী বড়লোক বাড়ির আধুনিক মেয়ে। পড়ালেখা করেছে, খেলাধুলায়ও তার বেশ নামডাক। রয়েছে প্রচুর বন্ধু – বান্ধব। বিশেষ করে ছেলে বন্ধুরা প্রায়ই তার কাছে নত হতে চায়৷ তপতীও মেশে তাদের সঙ্গে। এরকম জীবনের সাথেই সে অভ্যস্ত। বিয়ে ঠিক হয় বাবার পছন্দের সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক ছেলের সঙ্গে। কোনো এক কারণে বিয়ের দিন সব পণ্ড হয়ে যায়। মেয়ে যেন লগ্নভ্রষ্টা না হয়, তার জন্য তপতী কিছু বুঝতে পারার আগেই বাবা তার বিয়ে দেয় হতদরিদ্র তপনের সাথে৷ তপতীর বিশ্বাস ছিল তার বাবার প্রতি। তাই কোনো কথা না বাড়িয়ে বাবার কথায় রাজি হয়ে যায়। 
তপন গরীব ঘরের ছেলে। বাবা – মা কেউ নেই তার।
তাই পড়ালেখাও তেমন করা হয় নি,  তবে সে মূর্খও নয়। অন্য অনেক বিষয়ে তার বেশ জ্ঞান। পড়ালেখা না করেও সব বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য দেখে যে কোনো সাধারণ মানুষ মুগ্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু মন গলল না অহংকারী তপতীর। তার বড়লোক বাবা কি করে এরকম একটা রাস্তার ছেলের সাথে তার বিয়ে দিলেন সেটাই  ভেবে রাগে গা জ্বলতে থাকে তার। তপনকে স্বামী বলে বন্ধু – বান্ধব, আত্নীয় – স্বজনের সামনে নিয়ে যেতে হবে এটা ভেবেই সে লজ্জ্বায় মরে যায়। কিন্তু তপনের জ্ঞান এবং গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখে তপতীর বাবা – মা তাকে আপন করে নিয়েছে, নিজের ছেলের জায়গায় স্থান দিয়েছে। তপনের প্রতি বাবা – মায়ের এরূপ আধিক্ষেতা মোটেও পছন্দ হয় না তপতীর। সে সবসময়ই ভাবতে থাকে কী করে সকলের সামনে তপনকে অপদস্ত করা যায়। 

বর্তমান জীবনের সাথে যা যা মিল পাওয়া যায়:

পুরোনো ধাচের বই হলেও কাহিনি অনেকটা বর্তমান যুগের সাথে মিলে যায়। ফ্রি – মিক্সিং মানে ছেলে মেয়েদের অবাধ মেলামেশা তো এখন কোনো ব্যাপারই না। নির্দ্বিধায় ছেলেরা মেয়েদের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে উঠছে। মেয়েরাও যখন তখন ছেলেদের সাথে বেড়াতে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ বাবা – মায়েরও এ ব্যাপারে কোনো নিষেধ নেই। আর যদি নিষেধ করেও, ছেলেমেয়েরা তা শুনছে কই! “চিতা বহ্নিমান” বইয়ের তপতীও এরকমই মেয়ে। ধনীর দুলালী বখে যাওয়া অহংকারী মেয়ে, যে কিনা দরিদ্র বলে স্বামীকে অস্বীকার করে, সকলের কাছে ছোট করতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। বাস্তবে আজকালকার ছেলে – মেয়েদেরও পারিবারিক শিক্ষায় অনেকটা খামখেয়ালি রয়েছে। এরা দূর্বলদের মানুষ বলে গণ্যই করতে জানে না। অর্থনৈতিকভাবে যদি স্বামী পিছিয়ে পড়ে, প্রিয়তমা স্ত্রীও তখন তাকে কথা শোনাতে ছাড়ে না। এদিক দিয়ে তপতীর মধ্যে বেশ আধুনিকতার বিষাক্ত ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। 
অন্যদিকে তপন বেশ ধৈর্যশীল। তপতীর বেয়াদবি এবং মানসিক অত্যাচারও সে মুখ বুজে মেনে নেয়। ভাবে, হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কোনো একদিন হয়তো ধনী গরীব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে তপতী তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেবে। এ আশায় তপন তপতীকে কিছুটা ছাড় দেয়। যেটা আমাদের সমাজের ছেলেরা কখনও করবে না।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:

অনেক সময় এমন হয়, হুট করে অপরিচিত ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে মেয়েদের বুঝে উঠতে, মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে৷ নিজের পরিবার, আপনজনকে ছেড়ে নতুন মানুষের সাথে মিশতে তার ভারি কষ্ট হয়, মন খারাপ লাগে। এসময় তার স্বামী বা তার পরিবারের মানুষের উচিত মেয়েটিকে একটু স্পেস দেওয়া। মেয়েটি যেন সহজে মানিয়ে নিতে পারে, তার জন্য সাহায্য করা। কিন্তু অধিকাংশ স্বামীই ব্যাপারটা বোঝে না। মেয়েটির ভীত ও ভারী মনের উপর তারা আরোও বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। খুব কম ভাগ্যবতী মেয়েদের কপালেই সহজ পরিবার এবং ভালো মানুষ জোটে, যারা মেয়েটির সমস্যা সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেয়। এরকম যদি প্রত্যেকটা মানুষই কোমল হৃদয়ের হতো, তবে মেয়েরা বিয়ের ব্যাপার নিয়ে এতো ভয় পেতো না। যাই হোক, তপন সেরকমই সাধারণ এবং নরম স্বভাবের একটি ছেলে, যার সাথে এ যুগের ছেলের ছেলেদের তেমন মিল নেই, যাকে আধুনিকতা গ্রাস করতে পারে নি। 
প্রথমে যদিও তপন তার স্ত্রীকে সুযোগ দিয়েছিল, সবটা মেনে নেওয়ার জন্য সময় দিয়েছিল। অনেকদিন অতিক্রম হওয়ার পরেও তপতীর আচরণের কোনো উন্নতি ঘটে নি বরং তপতী তার স্বামীকে নিজের জীবন থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তার অপছন্দের অনেক কাজই করতে থাকে, নানা ভাবে তাকে অপমান করে। কিন্তু তপন কখনোই কোনো কিছুর প্রতিবাদ করে নি, তপতীর কোনো কাজে বাধা দেয় নি। এতে তপতী আরও ক্ষুব্ধ হতো। এভাবে বারবার অপমান করতে করতে এক পর্যায়ে সে তপনকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু অহংকারের চাদর সরিয়ে সে তপনকে কাছে ডাকতে পারে নি।
আর তপনও মনে মনে ভাবে, তপতী যদি মনে মনে অন্য কাউকে ভালোবেসে থাকে, তবে তার সাথে মিলিয়ে দিয়ে সে নিজে থেকেই চলে যাবে। কিন্তু এভাবে প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়ার পর তপনের মন একেবারে ভেঙে যায়। সে কিছু দিনের জন্য কাজের সূত্রে বাইরে যাবে বলে কায়দা করে তপতীকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যায়। সে বাড়িতে থাকাকালীন তপতী তাকে একটুও গ্রাহ্য করে নি। কিন্তু সে চলে যাওয়ায় তপতীর মনে ভারি কষ্ট হলো। এভাবে অনেক দিন কেটে যাওয়ার পর তপতীর মায়ের চিঠি পেয়ে  তপন বাড়ি ফিরে আসে, তাও আবার তপতীর সাথে বিচ্ছেদের জন্য। অবশেষে এতো মান – অভিমানের খেলা শেষে তপন ও তপতীর মধুর মিলন হয় কিনা, নাকি তপন সারাজীবনই চিরকুমার রয়ে যায়, তা বইটি শেষ করলে জানতে পারবেন। 

চিতা বহ্নিমান কেন পড়বেন:

এক কথায়, বইটি পড়ে বেশ লেগেছে। সাধুভাষায় এরকম আধুনিক গল্প আমি এর আগে পড়ি নি। যে কোনো মেয়ে তপনের কোমল চরিত্রের প্রেমে পড়তে বাধ্য। আর অন্যদিকে তপতীকে ধিক্কার জানানো উচিত, এরকম দেবতুল্য স্বামীকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। 
কাহিনীটি ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখক নিঃসন্দেহে তার জ্ঞানের স্পষ্ট ছাপ রেখেছেন। সত্যিই বইটি পাঠকদের উইশলিস্টে জায়গা করে নেওয়ার দাবী রাখে। প্রেম, ভালোবাসা, মান – অভিমানের পাশাপাশি অহংকারের পতন, গুরুজনের শ্রদ্ধা প্রভৃতির এক সুন্দর সংমিশ্রণ রয়েছে বইটিতে।

বইটি কারা পড়বেন:

সাধু ভাষা বোঝা বাচ্চাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য, তাই কম বয়সী নতুন পাঠকদের আমি কখনোই এই বইটি সাজেস্ট করবো না। তবে কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েরা এই বইটি পড়তে পারে, বিশেষ করে তরুণ তরুণীদের এই বইটি ভালো লাগবে।

আরো পিডিএফ পড়ুন- ক্লিক করুন

Join Community Banner

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

পিডিএফ টি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com