ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ১০টি কার্যকর উপায়

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

আজকের পোস্ট থেকে জেনে নিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ১০টি কার্যকর উপায় যা প্রাকৃতিক এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত। বাংলাদেশে শতভাগ ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিশেষত্ব হলো এটা সহজে নিরাময় যোগ্য। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ১০টি উপায়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু চিকিৎসা রয়েছে কিন্তু এই চিকিৎসাগুলো গ্রহণ করলে ডায়াবেটিস কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় যোগ্য হয় না। জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন আনলে ডায়াবেটিস সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আজকের পোস্টে আমরা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ১০টি কার্যকর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১) নিয়মিত ব্যায়াম 

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যায়াম একটি কার্যকর উপায়। নিয়মিত ব্যায়াম করার ফলে শরীরের রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়াও প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করার ফলে শরীরে ইনসুলিন কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় যার ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যোগব্যায়াম যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। এছাড়াও রয়েছে কার্ডিওগ্রাম যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে এবং হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

২) স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সহায়ক। সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে রক্তে শর্করার মাত্র নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব হয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের মধ্যে রয়েছে ফল এবং সবুজ শাকসবজি (আপেল, কমলা, গাজর, ব্রোকলি) যাতে থাকা ভিটামিন খনিজ এবং আঁশ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী। সঠিক পরিমাণে ফল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে থাকে। ফল এবং শাক সবজির পাশাপাশি রয়েছে সম্পূর্ণ শস্য (ওটস, বাদামি চাল,কুইনোয়া) যেগুলো রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও দীর্ঘ সময় যাবত পেট ভরে রাখে এবং এতে থাকা ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।

৩) ওজন নিয়ন্ত্রণ 

ওজন নিয়ন্ত্রণ করা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অপরিহার্য বিষয় কারণ এতে করে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় না বরং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতাও বজায় রাখে। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ওজন পরিমাপ করাও প্রয়োজন। একটি মেশিনের সাহায্যে প্রতি সপ্তাহে ওজন পরিমাপ করলে শরীরের ওজন পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এবং এতে করে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজতর হয় ফলশ্রুতিতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে এবং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় থাকে।

৪) ডায়েট পরিকল্পনা 

সঠিক ডায়েট পরিকল্পনার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। একটি সুষ্ঠু ডায়েট পরিকল্পনা আপনাকে একটা সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন দান করতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে পরিমাণ মতো সবজি, উপকারী ফল সমূহ, প্রোটিন যুক্ত খাবার এবং পরিমাণ মতো শস্য রাখা জরুরি। উপরিউক্ত খাবার সমূহের পাশাপাশি বেশ কিছু বিষয় সমূহ মনে রাখা প্রয়োজন যেমন সঠিক সময় মত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, চিনি এবং মিষ্টি যুক্ত খাবার একেবারে পরিহার করা এছাড়া স্বল্প চর্বিযুক্ত এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত খাবার গ্রহণ করা। নিয়মিত ওজন পরিমাপ করা এবং একটি সুষ্ঠু ডায়েট পরিকল্পনা মেনে চলা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় এবং শরীর সুস্থ রাখে।

৫) পর্যাপ্ত ঘুম 

প্রতিদিন সঠিক সময়ে ঘুমোনো শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী এছাড়াও পর্যাপ্ত ঘুম ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য আপনার স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন সম্ভব হয়। প্রতিদিন নিয়ম করে রাত দশটার মধ্যে ঘুমোতে যাওয়া উচিত এবং পরের দিন সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে পড়া উচিত এতে করে মস্তিষ্ক শান্ত থাকে। পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য ঘুমের পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। অন্ধকার শান্ত পরিবেশ এবং আরামদায়ক বিছানা পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য জরুরী।

৬) মাদকদ্রব্য পরিহার করুন 

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য পরিহার করা একান্ত জরুরী। শুধুমাত্র ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে নয় বরং রোগমুক্ত থাকার জন্য মাদকদ্রব্য পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান এবং মদ্যপানের অভ্যাস যদি থেকে থাকে তাহলে তা আমাদের শরীরকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে যে সকল খাবার ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো ধূমপান বা যে কোন মাদকদ্রব্য। ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়িয়ে তোলা ছাড়াও এগুলো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা গড়ে তোলে। তাই মাদকের অভ্যাস ত্যাগ করা অতীব জরুরী।

৭) মিষ্টি পরিহার করুন 

বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি ড. এ কে আজাদ খান বলেছেন, মিষ্টি জাতীয় খাবার গুলো স্থুলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ফাস্টফুড কোমর পানীয় এবং মিষ্টি যুক্ত খাবার গুলো আমাদের মেদ বাড়িয়ে তোলে যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞরা মিষ্টি জাতীয় খাবার বিভিন্ন ফাস্টফুড বা বিরিয়ানি এবং ভারী খাবার সমূহ না খাওয়ার পরামর্শ দেন। এছাড়াও সাদা আটার পরিবর্তে ভুষিওয়ালা আটার রুটি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই খাবারগুলোর পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর বা তেল চর্বিযুক্ত যেকোন খাবারই বর্জন করা উচিত।

৮) রক্তে চিনির মাত্রার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এড়াতে রক্তে চিনির মাত্রার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। যাদের বংশের কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রয়েছে তাদের উচিত অন্ততপক্ষে ৬ মাস পর পর রক্ত চিনির মাত্রার পরিমাপ করা। এবং শিশুদের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত একবার পরীক্ষা করা জরুরি। এটি পরীক্ষা করার জন্য সব সময় হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে এখন স্বল্প টাকা এবং অল্প সময়ের মধ্যে মেশিনের সাহায্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে থাকে। সেই সাথে বছরে অন্তত একবার লিপিড প্রোফাইল ও পরীক্ষা করতে হবে।

৯) যোগব্যায়াম এবং কার্ডিয়া অভ্যাস করুন 

যোগব্যায়াম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এটি আমাদের মানসিক এবং শারীরিক অবস্থার ও উন্নতি ঘটায়। যোগব্যায়ামের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আসন অনুশীলনের ফলে মাংসপেশি আরো সক্রিয় হয়। বিভিন্ন প্রকার যোগব্যায়াম যেমন সূর্যাসন পদ্মাসন, ভুজঙ্গাসন, বালাসন, পশ্চিমোত্তানাসন ইত্যাদি আসনসমূহ অনুশীলনের ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কার্ডিও ব্যায়াম যেমন প্রতিনিয়ত হাটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা এবং সাইকেল চালানো ইত্যাদি প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে অনুশীলন করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

১০) স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এর দিকে লক্ষ্য রাখুন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায় হল স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এর দিকে লক্ষ্য রাখা। কেননা স্ট্রেস যদি বাড়ে তাহলে রক্তে শর্করার পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। তবে এক্ষেত্রে মেডিটেশন করলে স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করা উচিত ফলশ্রুতিতে মন শান্ত থাকার পাশাপাশি রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পায়। যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

শেষ কথা

যারা ডায়াবেটিস নিয়ে চিন্তিত তারা আমাদের আজকের পোস্ট ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ১০ টি কার্যকর উপায় সম্পর্কে পরে উপকৃত হয়েছেন বলে আশা করছি। ডায়াবেটিস হলে দৈনন্দিন রুটিনে কিছু পরিবর্তনে এনে খুব সহজেই সুস্থ থাকা যায়। যেত ডায়াবেটিস কখনো সম্পূর্ণভাবে নিরাময় হয় না তাই শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য একটা স্বাস্থ্যকর রুটিন খুবই প্রয়োজন। সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি জুড়ে আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এবং এমন তথ্য ও আর্টিকেল পাওয়ার জন্য আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।

সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১) ডায়াবেটিস কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় কি? 

উঃ ডায়াবেটিস কমানোর জন্য হাঁটাচলা, শারীরিক ব্যায়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করার পাশাপাশি রক্তের গ্লুকোজ, লিপিড, রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

২) কোন খাবার ডায়াবেটিস বাড়ায়?

উঃ যেকোনো ধরনের প্যাকেটজাত খাবার, কেক, কোল্ড ড্রিংস, এনার্জি ড্রিঙ্কস, তেলে ভাজা বিভিন্ন খাবার এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার ডায়াবেটিস বাড়ায়।

৩) ডায়াবেটিসে ব্যায়াম কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উঃ নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করলে ইনসুলিনের ভারসাম্য বজায় থাকে। এছাড়া শারীরিক কসরত করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বজায় থাকে যা শরীরের জন্য এবং ডায়াবেটিস নিরাময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুগল নিউজে পড়ুন- পাঠক বিডি

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
0 মতামত সমূহ
মতামত
নতুন পুরাতন

Copyright © 2024 PathokBD.com