মিশরীয় সভ্যতা হলো উত্তর আফ্রিকার পূর্ব অঞ্চলের একটি অতি প্রাচীন সভ্যতা। নীল নদের নিম্নভূমি অঞ্চলে গড়ে ওঠে এই সভ্যতা। মিশর আফ্রিকা মহাদেশের একটি দেশ। নীল নদের এই মিশরের আরেক অর্থ হলো তার পিরামিড স্থাপত্য, শিল্প সাহিত্য, পুরানো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। মিশর শব্দটি দিয়ে একটি দেশ বা একটি শহরের সীমানা বোঝানো হয়। মিশরের মানুষ মিশর শব্দটি দ্বারা শব্দ বা প্রতীক বিশ্বাস করে।
মিশরের ভৌগলিক অবস্থান ও জনসংখ্যাঃ
নীলনদের দেশ মিশরের আয়তন প্রায় ৩,৮৫,২২৯ মাইল। যা সাগর, সমুদ্র বা মরুভূমি সীমানা দিয়ে খন্ডিত। পূর্বে লোহিত সাগর, পশ্চিমে বিস্তৃত মরুভূমি এবং উত্তরে দেখা যায় ভূমধ্যসাগর। মিশরের প্রধান ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য হলো নীলনদ ও সুয়েজ খাল। এই নীলনদ ও সুয়েজ খাল একসাথে যুক্ত করেছে লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরকে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে নীল নদের অন্যরকম সংযোগ আছে। নীলনদ তার মোট জলরাশির প্রায় ৮৫ ভাগ সংগ্রহ করে ইথিওপিয়ান মালভূমি থেকে। সিনাই উপদ্বীপের উত্তরাংশ, নীল উপত্যকা ও লোহিত সাগরের পাহাড়ি মরুভূমি এলাকায় বৃষ্টি নেই বললেই চলে। ১৯৯৬ সালে মিশরের জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৫২ লক্ষ। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় শতকরা ২১.৭ শতাংশ। ১৯৮৬ সালে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ৫০.৪ ভাগ।
মিশরের ধর্ম, উৎসব ও লোকাচারঃ
মিশরীয় সভ্যতা যেমন অনেক প্রাচীন তেমনি এর সংস্কৃতিও প্রাচীন। মিশরের ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রাথমিক পরিচয়ে ইসলাম ধর্মের কথাই শুরুতে আসে। ইসলাম ধর্মের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হলো সর্বত্র বিরাজমান একেশ্বর। অন্য চার স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে রামাদান উপবাস, মক্কায় তীর্থ করা যাকে আমরা বলি রোজা ও হজ্জ। তারা দিনে পাঁঁচবার নামাজ পড়ার পাশাপাশি ইশ্বরের প্রতি প্রার্থনা ও মুহাম্মদ পূজাও করতো। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া, বিপদ দূর করা ও বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের আশায় সাধারণ মানুষ এই কাজগুলো করে থাকে৷ তারা রহস্য ও অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলো বিশ্বাস করে বেশিরভাগ মানুষের মূল ধর্ম ইসলাম হলেও মিশরের জনজীবন গোষ্ঠী সমাজের বিভিন্ন লোকাচার পালন করে থাকে। অনেকে দেবতায় বিশ্বাস করেন, যেমন – আমুন, হোরাস, দেন্দেরা, এডফু, হাথর প্রভৃতি। তারা নানা ধরনের শোভাযাত্রা, মিছিল, সকালবেলার চাঁদ, সন্ধার দেবতার বিভিন্ন মন্ত্র ও বক্তৃতাধর্মী স্ত্রোত ইত্যাদিতে শামিল ছিল। এরকম সময়ে তারা পাখির মাংস, বিশেষ আকারের শস্য, বিশেষ ধরনের বিয়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখেন।
সামাজিক উৎসবঃ
মিশরীয় সমাজের সাধারণ ক্যালেন্ডারেই তাদের উৎসব অনুষ্ঠানের তালিকা দেওয়া থাকে। ঐতিহাসিকরা এসব উৎসবকে ‘বাৎসরিক উৎসব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মিশরীয়দের কয়েকটি উৎসব ও রীতির বর্ণনা নিম্নরূপঃ
১। ওপেট উৎসবঃ
মিশরীয় জনসমাজে ওপেট হলো চান্দ্র মাস বা বছরের দ্বিতীয় মাসে আয়োজিত জনপ্রিয় একটি উৎসব। এ অনুষ্ঠানে নাচ – গানের ব্যবস্থা করা হয়। লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, দেবতা ফারাও এবং আমুনের মধ্যে দৈবিক রূপান্তরের কোনো মিল আছে। আর এই অনুষ্ঠানেও নাকি দেবতারা অংশগ্রহণ করে। ওপেট উৎসবে সাধারণ মানুষ ‘থেবানরা’ ঈশ্বরকে নিজেদের পছন্দমতো প্রশ্ন করতে পারেন।
২। ওয়াগি ভোজনের আসরঃ
ওয়াগি হলো এক ধরনের খাদ্য সম্ভারের আসর, যেটা বছরের উনিশতম দিনে পালন করা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটি পালন করা হয়ে থাকে। এই দিনটি সত্য ও পবিত্র বলে মনে করা হয়। প্রথম দিন পালিত হয় চাঁদের অবস্থান অনুযায়ী এবং দ্বিতীয় দিন হলো সংশ্লিষ্ট মাসের আঠারো তারিখ।
৩। পুনর্জন্ম উদযাপনঃ
এই উৎসব পালনের একটি দেবতা হলো নেহেবকাউ, যার পুনর্জন্ম অনুষ্ঠান পঞ্চম মাসের প্রথম দিন পালন করা হয়। মনে করা হয়, এদিন নেহেবকাউ তার নিজস্ব ক্ষমতা নিয়ে হাজির হন। তার পরবর্তী পাঁচটি দিনকে দেবতার পুনর্জন্ম হওয়ার দিন মনে করা হয়। নেহেবকাউ উৎসবকে মিশরীয়রা তাদের নববর্ষ হিসেবেও পালন করে থাকে।
৪। মিন উৎসবঃ
রোগ, বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মিশরীয়রা নিজেদের লৌকিক দেবতার উপর গভীর বিশ্বাস রাখে। এভাবে ভালো কিছুর আশায় মিন দেবতার জন্ম। বছরের নবম মাসে এক বিশেষ দিনে মিন উৎসব পালন করা হয়। জানা যায়, নবরাজ্য যুগ থেকে এই উতসবের সূচনা। উদযাপনের শুরুতে রাজা নিজ হাতে প্রথম শস্য কাটেন।
৫। হেব-সেড উৎসবঃ
এই উৎসবটির প্রচলন রাজার শাসন পর্ব শেষ হওয়ার ত্রিশ বছর পর শুরু হয়। প্রত্যেক তিন বছর পর পর এই উৎসব পালিত হয়। বছরের প্রথম দিন শোভাযাত্রার মনোরম বর্ণাঢ্য আয়োজনে সেড উৎসবের উদযাপন ঘটতো।
৬। ওয়াগ উৎসবঃ
মিশরের জনসমাজ পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের জনগোষ্ঠীর মতো মৃত্যুকে শ্রদ্ধা ও পূজা নিবেদন করে। মৃত ব্যক্তি বা পূর্বপুরুষদের আত্নার দেখা তারা দৈনন্দিন জীবনে পান – এরকমই বিশ্বাস তাদের। এই বিশ্বাসের প্রথা হলো – প্রতি ঋতুর প্রথম মাসের আঠারো তারিখে মৃত ব্যক্তির দেখা পাওয়ার সৌজন্যে তারা Wag – ওয়াগ উৎসব পালন করে। এ উপলক্ষে মাসের বিভিন্ন দিনে হাকরো, ওয়াদা, থোথসহ নানারকম ভোজন উৎসবের আয়োজন করা হয়।
৭। খ্রিষ্টীয় উপবাসঃ
ক্রিস্টমাস, ইস্টার সান – ডে ছাড়াও মাসের প্রতি বুধবার ও শুক্রবার উপবাস করার চল আছে। খ্রিস্টানদের উপবাস কর্মে মাংসের কোনো ব্যবহার নেই। বিশুদ্ধ পানি ও পবিত্র শরীর নিয়ে যিশুখ্রিস্টের উপাসনা করাই হলো প্রকৃত অর্থে খ্রিষ্টধর্ম। তাদের এক গভীর বিশ্বাস হলো মাছ, মাংস, দুধ বর্জিত উপবাস তাদের শরীর, মন ও দেহকে বশীভূত করে মনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।
৮। উপহার প্রদানঃ
মিশরীয়দের সামাজিকতা ও সৌজন্যতার একটি রীতি হলো দান – বিনিময়ের রীতি। মিশরীয়রা কোনো বাড়িতে গেলে চকলেট, মিষ্টি ও পেস্ট্রি নিয়ে যান। বিশেষ কোনো পরিচিত বা বন্ধুর ক্ষেত্রে ফুল বা অন্যকিছুও তারা নিয়ে থাকে৷ ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য কম দামের মধ্যে সাধারণ উপহার নিয়ে যাওয়ার রীতি আছে।
মিশরীয়দের বিবাহ প্রথাঃ
সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিবাহ একটি অনিবার্য সামাজিক রীতি। মিশরীয় জনসমাজেও বিবাহ পদ্ধতির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সম্প্রতি বিবাহ করার ক্ষেত্রে মিশরীয়রা বিশেষ করে পাত্র বাছাই করার ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতের গুরুত্ব দেন। এক্ষেত্রে পরিবারের বড় কেউ বা অভিভাবকদের সাথে পরামর্শ করা হয়। বাড়ির সদস্যদের মতামত ছাড়াও শুধু পাত্র – পাত্রীর মতামতের ভিত্তিতেও বিয়ে ঠিক হতে পারে। এসব বিয়েতে ঘটকও অংশ নিয়ে থাকে। তবে পুরোনো দিনের রীতি – নীতি ক্রমশ কমে আসছে। এখন শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও বিয়ের পদ্ধতির আধুনিকতার ছাপ পাওয়া যায়। সাধারণত মিশরের মুসলিমরা একাধিক বউ রাখে না। শতকরা পাঁচ ভাগ ছেলেরা দু’বার বিয়ে করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে বউদের ঘর আলাদা হয়ে থাকে। মিশরীয়দের বিবাহ বিচ্ছেদ করা বেশ সহজ হলেও বিচ্ছেদের সংখ্যা খুব কম। বিবাহ থেকেই পরিবারের সূচনা। পূর্বে মিশরীয়দের মধ্যে যৌথ পরিবার দেখা যেত। এখন একক পরিবারের দেখা মিললেও আচার – অনুষ্ঠান পালনের সময় আত্নীয় – স্বজন সকলে একত্রিত হয়।
মিশরীয় সভ্যতা এর কৃতিত্বঃ
মিশরের অন্যান্য অনেক সভ্যতার মতো প্রাচীন মিশরীয়দের নানান কৃতিত্বে অবদান রয়েছে। খনি থেকে পাথর খনন, অট্টালিকা নির্মানের জন্য সমীক্ষা ও নির্মান কৌশলের দক্ষতা। এর জের ধরেই মিশরের পিরামিডসমূহ ও মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। মিশরীয় গণিত ব্যবস্থা একটি মহামূল্যবান বিষয়বস্তুর মধ্যে পড়ে। ব্যবহারিক ও কার্যকরী বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা সারা বিশ্ববাসীকে রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। মিশরীয় সভ্যতা এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মিশরীয়রা সেচব্যবস্থা ও কৃষি উৎপাদন কৌশলে অবদান রাখে। চীনামাটি ও কাচ শিল্পবিদ্যায় মিশরীয়রা বেশ এগিয়ে ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রাচীন মিশরের পুরাকীর্তিগুলোর ধ্বংসাবশেষ পর্যটক ও লেখকদের তাদের পেশা ও কাজে অনুপ্রাণিত করেছে।
চেক প্রজাতন্ত্রের ঐতিহাসিক দল যখন মিশরে খনন কাজ চালাচ্ছিল তখন তারা মিশরীয় সভ্যতার এক রানী খেনটাকাসের মাথার খুলি খুঁজে পান। সেই খুলি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকেরা জানতে পারেন যে কিভাবে মিশরীয় সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পুরোনো দিনের সেই সভ্যতাকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে পৃথিবীর অবস্থা যেমন ছিল, আজও তেমন আছে। খেনটাকাসের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পৃথিবী পুরোটাই তখনকার মতো ছিল। তার মৃত্যুর দুইশো বছরের মধ্যে সবকিছুর পরিবর্তন দেখা যায়। নীলনদের জলবায়ু পরিবর্তন হতে শুরু করে, আর সেই সাথে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় মিশরীয় সভ্যতা।
আশা করি আজকের আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। বিভিন্ন আর্টিকেল ও তথ্য পেতে প্রতিদিন আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। পাঠক বিডি’র পাঠক হয়ে সাথে’ই থাকুন। ধন্যবাদ আপনাকে।