বিচিত্র প্রাণী । আমাদের বৈচিত্রময় প্রাণিজগতের অজানা কথা

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

বিচিত্র প্রাণী নিয়ে অজানা কথা জানার জন্য আমাদের আজকের আর্টিকেল। আমাদের আশে পাশের কিছু প্রাণী সম্পর্কে আমরা জানি। এছাড়াও বনে – জঙ্গলে, দেশে বা দেশের বাইরে বহু প্রাণির সাথে আমরা পরিচিত। কোনোটি হয়তো বা আমরা নিজের চোখে দেখেছি। কোনোটি আবার শুধু বইয়ে বা টিভিতে অথবা মোবাইলে ছবিতে দেখেছি। প্রতিটি প্রাণী একে অপরের থেকে আলাদা। প্রত্যেক জাতিরই আলাদা ও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা থেকে বোঝা যায়, আমাদের প্রাণীজগত কত বৈচিত্রপূর্ণ।

বিচিত্র প্রাণী এর অজানা কথাঃ

বাংলাদেশে প্রায় ১৫,০০০ (পনের হাজার) এর বেশি প্রাণীর বসবাস। সারা পৃথিবীতে এর সংখ্যা দাঁড়ায় লক্ষাধিক। এদের মধ্যে বেশকিছু প্রাণী এখন বিলুপ্তপ্রায়। আবার বিদ্যমান থাকা প্রাণিদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রাণীর নামও আমরা জানি না। প্রিয় পাঠক আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে পৃথিবীর বিচিত্র প্রাণী সম্পর্কে অজানা বেশ কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। তাহলে আসুন জেনে নেই-

১। আফ্রিকান কুমিরঃ

বিচিত্র প্রাণী তো অনেক রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি আফ্রিকান কুমির। জলাশয়ের স্থায়ী বাসিন্দা ভয়ংকর এই প্রাণিটি পৃথিবীতে প্রায় দুইশ মিলিয়ন বছর ধরে বাস করছে। এরা দেখতে কুৎসিত, লম্বা মুখে বিশাল দাতের ভয়ংকর সারি, জলের উপর নাক ভাসমান অবস্থায় থাকে, চোখ দু’টি শিকারের জন্য সবসময় সতর্ক থাকে। কাঁটাযুক্ত ধারালো লেজ থাকে। দূর থেকে দেখলে পানিতে ভাসমান গাছের গুড়ি বলে ভ্রম হতে পারব। গায়ে অসম্ভব শক্তি, বাগে (আয়ত্বে) পেলে মানুষের মাংস ও বেশ মুখরোচক লাগে এদের কাছে। এরা খাবার চাবায় না, গিলে ফেলে। এদের মধ্যে নোনা পানির কুমির বেশি ভয়ংকর। ওজন এক টনের বেশি আর লম্বায় তিন থেকে পঁচিশ ফুটের হয়ে থাকে। বাজারে এদের চামড়ার বেশ কদর। কুমিরের চামড়ার মানিব্যাগ এক হাজার টাকার বেশি দরে বিক্রি করা হয়। কুমিরের চামড়ার চাহিদার জন্য এবং অন্যান্য কিছু কারণে পৃথিবীর বুক থেকে কুমির আজ বিলুপ্তের পথে। কিন্তু কুমিরের চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা বলে অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে কুমিরের চাষ শুরু করেছেন।

৩। লেমুরঃ

লেমুর হল মাদাগাস্কারের প্রাইমেট গোত্রভুক্ত কিছু প্রাণীর সমষ্টিগত নাম। ল্যাটিন শব্দ lemurs থেকে লেমুর শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ ভূতের মত। রাতের আধারে লেমুরের মুখে আলো ফেললে অনেকটা ভূতের মত দেখায় তাই এর নামকরণ এভাবে করা হয়েছে (তথ্যঃ উইকিপিডিয়া)। বড় আকারের লেমুরদের মধ্যে সবচেয়ে ওজনদার ছিল মেগালাডাপিস লেমুর। এরা গাছে চড়ত, আবার সাগরও পাড়ি দিতো। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া কিছু লেমুর প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল মেসোপ্রোপিথেকাস পিথিওকয়েডস লেমুররা। লেমুর মূলত নিরীহ ও ভীত প্রকৃতির। মাউজ লেমুররা নিশাচর, ফলমূল ও পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে। লেমুররাও আজ প্রায় ধ্বংসের পথে। বর্তমানে মাদাগাস্কারে প্রায় ২৮ প্রজাতির লেমুর আছে। এরা নিজেদের প্রজাতি আত্নীয় স্বজন চিনতে কখনো ভুল করে না।

৪। উটপাখিঃ

দৈহিক উচ্চতা ও আকার সব দিক দিয়েই উটপাখিকে পাখিদের ভেতর সবচেয়ে বড় বলা যায়। তাই এরা হলো পাখিদের বিগ ব্রাদার। পূর্ণ বয়স্ক একটি পুরুষ উটপাখির গলার দৈর্ঘ্য আট ফুট। দীর্ঘ গলার কারণে এরা শত্রুর আগমন দূর থেকে দেখতে পায়। তখন এরা গলা লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে নড়াচড়া বন্ধ করে দেয়। তখন এদের দেখে ছোট খাটো একটা ঝোপ বলে হয়। এদের কোনো খাবারেই অরুচি নেই। পাথর, কাচ, টিনের টুকরো, কাপড়, হাতঘড়ি যা পায়, তাই এরা গিলে ফেলে। এদের চামড়া দিয়ে মানিব্যাগ, বেল্ট, জুতা ইত্যাদি বানানো হয়।

৫। বেজিঃ

বিচিত্র প্রাণি এর মধ্যে বেজিদের বেশিরভাগের বসবাস আফ্রিকায়। আফ্রিকায় অন্তত ২৩ রকমের বেজি আছে, মাদাগাস্কারে আছে চার ধরনের। বেজিদের অনেকেই নিশাচর। নিজেরাই নিজেদের খাবার শিকার করে। এছাড়াও ডিম, ফলমূল, বাদাম, সাপ, বিছাও খেয়ে থাকে। এছাড়া ছোট সাইজের বামন বেজির বসবাস সাভানা মরুভূমি এবং অরণ্য ঘেরা দেশে। বিশেষ করে যেসব দেশে উইপোকা এবং পিঁপড়া দের ঢিবি আছে। মাত্র ২৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার বামন বেজিদের সাহস অনেক। আরেক রকম বেজি আছে যাদের বসবাসের জন্য প্রিয় স্থান জলাভূমি, এদের নাম জলবেজি। এরা সাঁতারে বেশ দক্ষ। সাদা লেজের বেজিরা হয়ে থাকে বেশ লাজুক। বেজিরা স্নেহপ্রবণ। মা বেজি এক সাথে তিন চারটি বেজির জন্ম দেয় আর জন্মের সময় বেজিরা থাকে অন্ধ।

ডাক ব্যবস্থা । প্রাচীন বাংলার ডাক ব্যবস্থা নিয়ে অজানা ও চাঞ্চল্যকর ২৫টি তথ্য

৬। মাউন্টেন লায়নঃ

পাহাড়ি সিংহদের বাস রকি মাউন্টেন এলাকায়। এদের অপর নাম কুগার বা পুমা। এই সিংহ গুলো অনেক ভীতু। একান্ত দরকার না হলে এরা কাউকে আক্রমণ করে না। তারপরেও রকি মাউন্টেনে যারা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে যায়, তাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়। এরা লম্বায় ছয় থেকে আট ফুট এবং ওজন ২০০ ফুটের মধ্যে হয়ে থাকে। মাউন্টেনের সিংহরা একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। তবে বাচ্চা থাকলে একা যায় না, নিরাপত্তার জন্য দল বেঁধে বের হয়।

৭। জিরাফঃ

জিরাফ বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাণি। প্রাপ্তবয়স্ক জিরাফ লম্বায় মানুষের চাইতে তিন গুণ বেশি লম্বা এবং ওজনে দশ গুণ বেশি। এদের চেহারা দেখে নিরীহ মনে হলেও আসলে তা নয়। এদের পায়ে এতো শক্তি যে লাথি মেরে সিংহ হত্যা করতে পারে। জিরাফ বসে থাকতে বেশি পছন্দ করে। এরা দল বেধে থাকতে পছন্দ করে, দলের সদস্য সংখ্যা পঞ্চাশ বা তারও বেশি। প্রাপ্ত বয়স্ক জিরাফ একা থাকতে পছন্দ করে। জিরাফের বাচ্চার উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট। বাচ্চাদের মুখ থেকে গোলাপ আর মসলার গন্ধ আসে। জিরাফের গায়ে রক্ত বেশি। একটি জিরাফের রক্ত দিয়ে দশ গ্যালন দুধের জগ ভরা যাবে। জিরাফের হৃৎপিন্ড অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত পাম্প করে প্রতিদিন। এদের হৃৎপিন্ড মানুষের হৃৎপিন্ডের চেয়ে কমপক্ষে চল্লিশ গুণ বড়।

৮। মাণ্টা – রেঃ

মাণ্টা – রে দৈর্ঘ্যে যতটুকু, প্রস্থে তার দ্বিগুণ। এদের দু’পাশে রয়েছে বিশাল দুই পাখনা। এরা ওজনে ৩০০০ ফুটেরও বেশি। মাণ্টা – রে থাকে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলভূমিতে। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। মাণ্টা – রে এর বড় শত্রু হলো হাঙর ও তিমি। অনেক সময় ছোট আকারের শত্রুর মুখে পড়ে প্রাণ হারাতে হয় উপযুক্ত অস্ত্রের অভাবে।

৯। পিঁপড়াঃ

পিঁপড়াদের মতো হিংসুটে আর ঝগড়াটে কীট পৃথিবীতে দু’টি পাওয়া মুশকিল। এদের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয় অন্যান্য পতঙ্গ হত্যা করে এবং অন্যদের আস্তানায় হামলা করে। এরা ছোট আকারের প্রাণিদের শত্রু বানালেও অনেক সময় মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এগুলো কামড় দিয়ে গরুর বাছুর এবং মানব শিশু খুজ করে ফেলতে পারে। এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০,০০০ প্রজাতির পিঁপড়ার সন্ধান পেয়েছে। মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় পিঁপড়া হলো সেমানাস। অত্যন্ত বিষাক্ত এই পিঁপড়ার কামড় থেকে সুস্থ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে।

১০। হামিং বার্ডঃ

উড়ন্ত হামিং বার্ডের পিঠে তার সাদা পাখা আন্দোলিত হয় প্রতি সেকেন্ডে আশি বার। পাখার এই দ্রুত গতির ফলে মৃদু গুঞ্জন হয়, এখান থেকেই এর নামকরণ। এটি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম পাখি। এরা ডিম পাড়ে মে – জুন মাসে। এদের ডিম মটর দানার সমান। স্ত্রী হামিংবার্ডের বাসা গাছের সরু একটা ডালের সাথে মাকড়সার সুতা দিয়ে বাধা থাকে। পাখিদের জগতে শরীরের ওজনের অনুপাতে হামিংবার্ডের বিপাকক্রিয়া বেশি, তাই এদের প্রচুর খাবার দরকার।

১১। পিরানহাঃ

এটি একটি মাছ। ল্যাটিনে এই মাছটার নাম সেরাসালমাস ন্যাটেররি। দেখতে অন্যান্য মাছের মতোই। কিন্তু যখন কামড় দেয়, নিচের পাটির খাঁজে ওপরের পাটি বসে যায়। ফলটা দাঁড়ায় মারাত্মক। দক্ষিণ আমেরিকার নদীর প্রায় চল্লিশ মাইল জুড়ে আছে কয়েক প্রজাতির পিরানহা। পিরানহা নামক এই বিচিত্র প্রাণী আন্দিজ পর্বতমালা, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, গায়না, দক্ষিনের বিশাল আমাজন বেসিন, বলিভিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার সর্বত্র বিরাজ করে।

১২। মাকড়সাঃ

অনেকেই মাকড়সা দেখে ভয় পায়, অপছন্দ করে। কিন্তু মাকড়সার মতো শান্ত প্রাণি খুব কমই আছে। উন্নত বিশ্বের চিকিৎসকরা মাকড়সাকে মানবদেহের কল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা করছেন। তাঁরা মনে করেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের ব্রেন সেল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে মাকড়সার বিষ। এক সময় ফ্রান্সে দস্তানা ও মোজা তৈরি হতো মাকড়সার জাল দিয়ে। মাকড়সার জাল ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়ানরা মাছ শিকার করে। এরা মাংসাশী প্রাণী। এদের মধ্যে স্ত্রী মাকড়সা অনেক নিষ্ঠুর হয়ে থাকে।

এগুলো ছাড়াও গাছে চড়া শেয়াল, রেইন ফরেস্টের জীব, ঘড়িয়াল, ব্যাঙ, সাপ, গিনিপিগ, তিমি প্রভৃতি বিচিত্র জীব রয়েছে পৃথিবীতে। অসংখ্য প্রাণির সমারোহ আমাদের এই ধরনীতে। নানা রকম প্রাণির সমন্বয়ে গঠিত এই বসুন্ধরা। আশা করি আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আবার কোনো নতুন আর্টিকেলে কথা হবে। ধন্যবাদ।

গুগল নিউজে পড়ুন- পাঠক বিডি

যোগ দিন পাঠক ফোরাম কমিউনিটিতে

আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন বিষয় জানুন, আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং সমমনা পাঠকদের সাথে আলোচনা করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
সাবস্ক্রাইব
নোটিফিকেশন
guest
Ratting
1 মতামত
মতামত
নতুন পুরাতন
Arif Hosen
Arif Hosen
অতিথি
February 4, 2024 9:56 am
Ratting :
     

ভালো লাগলো তথ্য গুলো। ধন্যবাদ

Copyright © 2024 PathokBD.com