বসন্ত হলো ঋতুর রাজা। বসন্ত আসলেই মনের মধ্যে অন্য রকম এক প্রশান্তি কাজ করা শুরু হয়। দখিনা দুয়ারে ফাগুনের হাওয়া। কোকিলের কন্ঠে ফাগুনের আগমনী গান। গাছে গাছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। এসব কিছুই জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে এলো বসন্ত। গাছে গাছে ফুল ও প্রজাপতির মেলা বসন্তেরই বহিঃপ্রকাশ। ভ্রমরের গুনগুন প্রতিনিয়তই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বসন্ত আসতে আর বেশি দেরি নেই। বসন্ত এসে গেছে।
বসন্ত এর পরিচয়ঃ
ষড়ঋতুর মধ্যে সর্বশেষ ঋতু হলো বসন্তকাল। বসন্তকে বলা হয় সকল ঋতুর রাজা। শীতের পরে এবং গ্রীষ্মের আগে ঋতুরাজ বসন্ত বিরাজ করে। এসময় দেশের অনেক প্রান্তেই গাছের নতুন পাতা গজায়, ফুল ফুটে। যেমনঃ কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, শিমুল, মহুয়া ইত্যাদি।
বসন্তের ইতিহাসঃ
বাংলা ১৪০১ সনে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘বিসন্ত উৎসব পালন করা হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বসন্তে উৎসব পালিত হয়ে আসছে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৩ ই ফেব্রুয়ারি অথবা ১৪ ই ফেব্রুয়ারিতে আমরা পহেলা ফাল্গুন পালন করে থাকি। আর পহেলা ফাল্গুনকে বাঙালিরা বিশেষ উৎসবের সাথে পালন করে থাকে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের শান্তি নিকেতনেও বসন্ত উৎসব পালন করা হয়।
রঙিন বসন্তঃ
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। এক এক করে মৌসুম পেরিয়ে সবশেষে আসে বসন্ত। বাংলা বারো মাসের মধ্যে শেষ দুই মাস ফাল্গুন ও চৈত্র নিয়ে বসন্তকাল। বাংলা ফাল্গুন মাসের এক তারিখ অর্থাৎ পহেলা ফাল্গুন বাঙালিরা বেশ আনন্দের সাথে উদযাপন করে। এভাবে সাজ সাজ রব ও রঙিন ফুলের সমাহারে বরণ করা হয় ঝতুরাজ বসন্তকে।
- ডাক ব্যবস্থা । প্রাচীন বাংলার ডাক ব্যবস্থা নিয়ে অজানা ও চাঞ্চল্যকর ২৫টি তথ্য
- ছাত্রজীবনে ইনকাম করার সহজ ১০ টি উপায়
- বিচিত্র প্রাণী । আমাদের বৈচিত্রময় প্রাণিজগতের অজানা কথা
- সহজে ইংরেজি শেখার সেরা ১০টি উপায়
- আবেদন পত্র লেখার নিয়ম । দরখাস্ত লেখার নিয়ম ২০২৪
বসন্ত মানে পূর্ণতা, নতুন প্রাণের কলোরব। বসন্ত মানে একটি বিশেষ সময়। বসন্তে গাছে নতুন পাতা আসে। ডালা ডালে দেখা মিলে কোকিলের এবং প্রকৃতি সেজে ওঠে বর্ণিল রঙে। এই সময় বাতাসে ফুলের রেণু ছড়ায়। প্রকৃতি হয়ে ওঠে অপরূপ সজীব। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এতো রঙিন সাজ। সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে বিভেদ ভুলে নতুন কিছু প্রত্যয়ের সাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে বসন্তের উপস্থিতি। তাই কবির ভাষায়- “ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক, আজ বসন্ত।”
বসন্ত উদযাপনঃ
বছরের এই সময়টিকে একটু নান্দনিকভাবে বরণ না করে নিলেই নয়। প্রকৃতি নিজেই যেন বরণডালা নিয়ে হাজির হয়, আর তাতে থাকে বিভিন্ন বর্ণিল উপাদানের সমাহার। যা দিয়ে আমরা সাজিয়ে তুলতে পারি নিজেদের, রাঙিয়ে তুলতে পারি আমাদের জীবন, কাটাতে পারি কিছু সুন্দর মুহূর্ত। বিশেষ করে বসন্তের প্রথম দিনে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নানাভাবে এই বিশেষ দিনটিকে উদযাপন করে থাকে। তার কিছু বর্ণনা নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ
মেলাঃ
বসন্ত আসতে আরোও কয়েকদিন বাকি থাকলেও ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে তোড়জোড়, যার মধ্যে একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো মেলা। পহেলা ফাল্গুনে অনেক জায়গায় মেলা বসে। বিভিন্ন বয়সের ও বিভিন্ন শ্রেণি – পেশার মানুষ এই মেলায় উপস্থিত হয় এবং বসন্তের মেলাও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ও বর্ণিল হয়। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার লালমাটিয়া, রাজশাহী, গাজীপুর সহ আরোও বেশকিছু জায়গায় মেলা বসে থাকে। বৈচিত্রময় ও সৃষ্টিশীল পণ্যের পসরা নিয়ে এসব মেলার মাধ্যমে এগিয়ে চলছে নারী উদ্যোক্তারা। এছাড়াও বসন্তকে বরণ করতে ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে আকর্ষণীয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিয়ে মেলায় হাজির হয় ব্যবসায়ীরা। পোশাক ও তার সাথে আনুসাঙ্গিক কানের দুল, গলার মালা, বিভিন্ন বাহারের, জুয়েলারি, ফুলের গহনা, শাড়ি, কুর্তি, খাবার এবং ঘর সাজানোর উপকরণ ইত্যাদি সবকিছু এক ছাদের নিচে পেয়ে ভোক্তারাও বেশ খুশি। ফাল্গুনের মেলায় কেনাবেচা ভালো হয় বিধায় উদ্যোক্তারাও বেশ খুশি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের চলার পথ সহজ করতে এমন এক আয়োজন।
| ক্যান্সার কি? বিভিন্ন ক্যান্সারের কারণ ও প্রতিরোধে করণীয় |
পিঠা উৎসবঃ
বসন্তের আগমনে বসন্তকে শুভেচ্ছা জানাতে বাঙালিরা পিঠা উৎসবের আয়োজন করে থাকে। বিভিন্ন স্কুল, কলজের শিক্ষার্থীরা মিলে এ আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও বাসায় যারা ভালো রান্না করেন, পিঠা বানাতে পারেন, যারা হোমমেড খাবার, কেক, পিঠা ইত্যাদি অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করেন, তারাও একটি দল হয়ে মেলার আয়োজন করে থাকেন। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বা দলের আলাদা আলাদা স্টল থাকবে, যেখানে তারা নিজেদের পিঠা এবং অন্যান্য খাবার গুলো দামসহ উপস্থাপন করবে। আর ক্রেতারা তাদের পছন্দসই দোকান থেকে পিঠা, কেক ইত্যাদি কিনে খেতে পারবে। এতে করে ক্রেতারা ঘুরাঘুরি করে মনে প্রশান্তি আনার সাথে সাথে পেটও ভরাতে পারবে। অন্যদিকে খাবার ব্যবসায়ীরাও মেলায় বেশ লাভবান হন। এসব মেলায় মালপোয়া, দুধপুলি, নারকেল পুলি, পাটিসাপটা, নকসি পিঠা সহ নানা ডিজাইনের পিঠা পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি ঘরোয়া খাবার ব্যবসায়ীদের বাসায় বানানো জরদা, পায়েস, ফিরনী, কেক, বিস্কিট সহ অনেক খাবার ও বিক্রি করতে দেখা যায়।
বসন্তের খাওয়া-দাওয়াঃ
প্রতিদিনের সকালের নাস্তায় প্রতিদিনই রুটি-ভাজি, সবজি, ডিম ইত্যাদি খাওয়া হয়। বসন্ত বরণের দিনটিতে একটু ভিন্নতা আনাই যায়। সকালের নাস্তায় ভিন্নতা এনে দিনটিকে ঘরে বসেই উপভোগ করা হয়। এক্ষেত্রে চালের রুটির সাঠে হাঁসের মাংস বা খুদের ভাতের সঠে ৪-৫ রকমের ভর্তা দিয়ে দিনটি শুরু করতে পারেন। এইতো গেলো সকালের খাবার, দুপুরের জন্য চাই স্পেশাল ডিশ, সেই সাথে স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সাবধানে ঘরোয়া খাবারেই আনন্দ নিতে পারেন। যেমনঃ
দুপুরের মেনুতে কার্বোহাইড্রেট এর চাহিদা মেটানোর জন্য সাদা পোলাও বা দিনটিকে আরেকটু স্পেশাল করার জন্য গাজর পলাপথবা আফগানি পোলাও রান্না করতে পারেন। এর সাথে থাকতে পারে মাছের চপ, কাটলেট, মাছের দোলমা, মাছের কোরমা, গ্রিলফিশ বা মাছের কাবাব এর মধ্য থেকে এক বা দুটি আইটেম। এতে মাংসের আইটেম কম বা না করলেও চলবে। এছাড়া কেউ বিরিয়ানী রান্না করতে চাইলে এতগুলো সাইড ডিশ রাখার দরকার নেই। সাথে শশা, গাজর, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, টকদই ও সবজির মিশ্রণে সালাদ তৈরি করুন, যা ভিটামিন ও মিনারেলপ্রদান করবে। সারাদিন ঘুরাঘুরি ও অতিথি আপ্যায়নের পর রাতে ক্লান্তি নিয়ে ফেরার পর রাতের মেনুতে খুব বেশি আইটেম রাখবে না। রুটি সবজি বা রুটির সাথে অল্প একটু মাংসের তরকারি খেয়ে নিতে পারেন। এভাবে বিশেষ দিনটি খাওয়া-দাওয়ায় আয়োজন করতে পারেন। খাবারের পাশাপশি বেশি বেশি পানি ও ফলের রস পান করতে হবে। এতে করে শরীর সতেজ থাকবে।
বসন্তের সাজগোজঃ
বসন্ত মানেই গাছে নতুন শাখা ও পাতায় মেলা, ফুল ও প্রজাপটির বাহারি রঙের খেলা। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে তরুণ- তরুণীর প্রাণে দেয় দোলা। দিনটিকে বিশেষ করে তোলার জন্য দশ থেকে ত্রিশ বয়সী প্রায় সকল ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাজ সাজ রব পরে যায়, যা পহেলা ফাল্গুনের একটি অন্যতম সৌন্দর্য এর বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতির রঙের ছড়াছড়ির এই সময়টাতে আপনার পোশাকেও থাকা চাই রঙের বাহার, অনেক মেয়েরা এই দিনটিতে শাড়ি পরতে পছন্দ করে। যে মেয়েটি শাড়িতে অভ্যস্ত নয় সেও একটি দিন শাড়ি পরে বের হতে চায় প্রিয় মানুষদের সাথে। বসন্তের দিনে কোন শাড়িটি পড়বেন বাছাই করতে না পারলে একরঙা ব্লাউজের সাথে নিতে পারেন।
| গৃহ সজ্জা – গৃহের অভ্যন্তরীণ সজ্জার ৯টি সহজ উপায় |
বিভিন্ন রঙের সমন্বয়ে কালারফুল শাড়ি, তা হতে পারে হলুদ, কমলা, ল্লা, গোলাপী যেকোনো রঙেরই মিশ্রণে একটি শাড়ি অথবা বাহারি রঙের ব্লাউজের সাথে একরঙা একটি শাড়ি পরতে পারেন। হলুদ জমিনের ও কমলা পাড়ের শাড়ি, কমলা জমিনের মেজেন্ড পাড়ের শাড়ি বা যারা শাড়ি পড়তে পছন্দ করেন না তারা বাসন্তী রঙের বা গোলাপী, টিয়া রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। আপনার অন্য কোনো পছন্দসই এর সাথে ম্যাচিং গলার হার বা মালা, কানের দুল, চুড়ি পরে চুলে একটি খোঁপা করে ফুল গুঁজে দিতে পারেন। চাইলে চুল গুলো খোলা ছেড়ে রেখে ফুল দিয়ে চুলকে সাজাতে পারেন আর ছেলেরা বন্ধু বা প্রিয়তমার সাথে বের হতে চাইলে সাদা, হলুদ, কমলা, টিয়া, মিষ্টি যেকোনো রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা পড়তে পারেন।
ফুল দিয়ে সাজুনঃ
বসন্তের সাজের মধ্যে সবচাইতে বেশি আকর্ষণীয় লাগে যদি চুলে বসন্তের ফুল দিয়ে সাজানো যায়। বেশ কয়েক বছর ধরে বসন্তের সাজে চুলের স্টাইলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফুল দ্বারা তৈরি ক্রাউন। এছাড়া আর যেরকম ভাবে নিজের চুলকে সাজাতে পারেন, তার কিছু টিপস নিচে দেওয়া হলোঃ
১. খোলা চুলে রমণীদের বেশি সুন্দর লাগে। তবে চুল বড় হলে ত খোলা রেখে অনেকেই সামলাতে পারেন না। তারা ঢিলে করে একটি খোঁপা করে নিতে পারেন। খোঁপায় একটি ফুলের খোঁপাও লাগাতে পারেন, এরই দেখতে বেশ দৃষ্টিনন্দন হবে।
২. দুপাশে খেজুর বেনি করে দুটি বেনিতেই ফুল গুঁজতে পারেন। একপাশে সাধারণ বেনি করে ও বেনির প্রত্যেকটি কোটায় ফুল লাগিয়ে সৌন্দর্য বাড়াতে পারেন।
৩. সামনের দিকে ছোট করে কাটা চুল অগোছালো করে রেখে পেছনের খোঁপা বা একপাশে বেনি করতে পারেন। তাছাড়াও সামনের মেসি চুলের সাথে পেছনের চুল কোঁকড়া করে ফুল ব্যবহার করলেও তা দেখতে ভালো লাগে।
৪. চুলের যে স্টাইলেই করুন না কেন, বড় ফুল হলে কন একটি বড় ফুল গুঁজে দিলে সুন্দর লাগবে। আর যদি চুলে ফুল গুঁজতে চান তবে ছোট ছোট ফুল যেমন – চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেন্ডুলা, বেলী, শিউলী ইত্যাদি ফুল লাগাতে পারেন। এছাড়াও একটু ভিন্নতা আনতে ফুলের কলি বা কাঠগোলাপের কলিও লাগাতে পারেন।
| শীতকালে চুলের যত্ন । ১০টি টিপস যা চুল পড়া বন্ধ করবে, থাকবে না খুশকিও |
এ তো গেলো ফুল দিয়ে চুলের সাজ, চুলের পাশাপশি গয়না হিসেবেও ফুল ব্যবহার করতে পারেন। রজনীগন্ধা ও গোলাপ ফুলের মালা, কানের দুল পড়তে পারেন। গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে হাতে পেঁচিয়ে রাখতে পারে। তবে যাদের ফুলে অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা আছে তারা সত্যিকারের ফুল এড়িয়ে চলবেন। এক্ষেত্রে তারা আর্টিফিসিয়াল কাপড়, কাগজ বা প্লাস্টিকের ফুলের অলংকার ব্যবহার করতে পারেন।
আশা করি বসন্ত নিয়ে আর্টিকেলটি আপনার ভালো খুব লেগেছে। আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। কথা হবে আবার কোনো নতুন আর্টিকেলে। ধন্যবাদ।